সর্বশেষ :

অসহিষ্ণু সমাজ!

নিপুল কুমার বিশ্বাস ১১:০১, ২৫ অক্টোবর ২০১৯

পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। প্রতিদিন পত্রিকা, টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপর চোখ রাখলেই দেখতে পাওয়া যায়। প্রতি দিনের অসহিষ্ণু ঘটনাগুলি সমাজের সাধারণ নিরীহ, সচেতন ও শান্তিপ্রিয় মানুষ গুলিকে ভাবিয়ে তুলছে । এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার পাঁচ শত সত্তর বর্গকিলোমিটার মাতৃভুমির প্রতিটি পাড়া মহল্লায় নানা ধর্মের ও বর্ণের মানুষের মাঝে বিবিধ সাংস্কৃতির মিলন মেলার রেওয়াজ আবহমান বিরাজ ছিল। ঈদ, পূজা, বড়দিন, মেলা, গ্রাম্য যাত্রা পালা, জারিগান, কবি গান, ভাবগান, গাজী-কালু চম্পা বতীর পালা পাড়া মহল্লার সকল ধর্ম বর্ণের মানুষ গুলি এক সাথে এক হয়ে যেমন আয়োজন করত তেমনি সবাই মিলে রাত দিন একত্রে মিলেমিশে থেকে উপভোগও করত । আবহমান বাংলার গ্রাম বা মহল্লায় ফুট বল,ভলিবল, দাঁড়িয়া বান্ধা , হা-ডু-ডু, গোল্লা ছুট, ডাংগুলি, কানা মাছি, বৌচি সবাই মিলে একাত্ব হয়ে খেলা হতো। কারো ক্ষেত-খামারে বা গাছে কোন নতুন ফল, শবজি বা তরিতরকারি উৎপাদন হলে প্রতিবেশীদের দিয়ে খাওয়ার রেওয়াজ ছিল। মাঠের উৎপাদিত ফসল প্রতিবেশীরা সবাই মিলে একে অপরের সহযোগিতার মাধ্যমে ঘরে তোলা হতো।
বাঙালী সমাজে, সমাজ ব্যবস্থায় একটি আদর্শ পরিবার বলতে একান্নবতী পরিবার বোঝানো হতো। একটা সময় ছিল একক পরিবারের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক। একান্নবতী পারিবারের নিয়ন্ত্রক থাকত পরিবারের সব চেয়ে প্রবীন ব্যক্তি। যার বয়স বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ষাট, সত্তর, আশি অথবা আরো বেশি। সেই অভিভাবকের অনুমতিতে পরিবারের সকল সদস্যের ঘরের বাহিরে গমন,আতœীয় বাড়িতে যাওয়া, থাকা-খাওয়া, পরিবারের কারো বিবাহ কার্য সম্পাদন, সামাজিক ক্রিয়াকর্মাদি সম্পন্ন করা, এমনকি এলাকার জনপ্রতিনিধি নির্ধারন করতেও কাকে নির্বাচিত করতে হবে তা পরিবারের প্রবীন ব্যক্তির সিদ্ধান্তের উপর ন্যাস্ত থাকত।
ছোট বেলায় পাড়া বা মহল্লার সমবয়সী কারো সাথে দ্বদ্ধে জড়ানো, ঝগড়া-বিবাদ করা অথবা কোন প্রকার কোন ময়মুরুব্বিদের সাথে বিয়াদপী করলে মা-বাবার হাতে পিটুনি খাওয়ার ভয়ে সারাদিন বাড়ীতে আসত না। রাস্তায় গাছের গোড়ায় বসে থাকত নয়তো প্রতিবেশি কোন বাড়িতে লুকিয়ে থাকত। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলে আস্তে আস্তে প্রতিবেশি চাচা জেঠার বাড়িতে লুকিয়ে আশ্রয় নিত। বাড়ীর ভিতর থেকে শুনতে পাওয়া যেত বদমাইশ আজ বাড়িতে আসুক ওর বিয়াদবী করা মানুষের সাথে ঝগড়া-বিবাদ করা বুঝিয়ে দিব। বুকটা তখন আরো দূর দূর করত। অবশেষে দাদা-দাদীর কেউ এসে তাদের পিছনে লুকিয়ে বাড়িতে নিয়ে যেত। কিন্তু লুকিয়ে নিয়ে গেলেও মা বাবার হতের লাঠি শাসন করার জন্য দাদা-দাদীকে ডিঙিয়ে এর মধ্যে কয়েক বার ধুম-ধাম পিঠে পড়ে যেত। এর মধ্যে দিয়ে একটা ছেলে বা মেয়ে অন্যায় কাজ, ঝগড়া বিবাদ, মারা-মারি, গুরু জনে অশ্রদ্ধা করা থেকে দূরে থাকত, ভয় পেত । শিক্ষা পেত শাসন,ভয়, ছোটদের প্রতি ¯েœহ করা, গুরুজনে শ্রদ্ধা করা। আবার সমাজের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ অভিভাবক থাকতেন, যিনি সমাজের উপর কড়া নজর রাখত। কর্তৃত্ব রেখে সমাজের নানা বিচার আচার করে গেছেন। সমাজে অসামাজিক কর্যাকলাপ, গুরুজনে অশ্রদ্ধা, অনিয়ম, প্রতারনা তেমনটি ছিল না। দরিদ্র লোকের সংখ্যা বেশি ছিল, ধনী লোকের সংখ্যা কম ছিল তবে শৃঙ্খলিত সমাজ ছিল। কখনও যদি কোন শিক্ষকের সাথে রাস্তায় দেখা হয়েছে তো সাথে সাথে সাইকেল থেকে নেমে সম্মান প্রর্দশন করা ছিল সমাজের অংশ। গুরুজনকে দেখলে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বসতে দেওয়া , দেখা মাত্রই ধুমপান , মার্বেল খেলা, ডাঙ্গুলি খেলা বন্ধ করে নিজেকে লুকিয়ে রাখা। সবাইকে নিয়ে খাবার গ্রহণ করা, খাবার ভাগ করে খাওয়া, দলবদ্ধভাবে এক অন্যের কাজে সহযোগিতা করা।
সমাজে প্রচলিত ছিল ছেলেটি শান্ত,নর্ম, ভদ্র, বিনয়ী আর এখন বলা হয় ছেলে টি ডানপিটে, সাহসী যে কোন কাজ খুব সহজেই ক্ষমতা ব্যবহার করে সমাধান করার ক্ষমতা আছে । সহজ সরল ব্যক্তিদের এ অসহিষ্ণু সমাজ বোকা ভাবে। অসহিষ্ণু এই সমাজে মানুষের সাথে গর্ব করে শ্বাশুড়িদের বলতে শুনা যায়, আমার জামায়ের উপ্রি আয় প্রচুর, বিয়ের কয়েকদিনের মাথায় মেয়ের নামে ফ্লাট কিনে দিয়েছে। ছেলের মায়েদের আতœনাদ করতে শোনা যায় বিয়ের পর আমার ছেলেটি পর হয়ে গেছে। বৃত্ত ভৈববে প্রাচুর্যে ও যস খ্যাতি সম্পন্ন সন্তান গুলি মা-বাবার খোঁজ খবর ঠিক মতো রাখে না, কেউ কোটি কোটি টাকা থাকা সত্বেও মাঝে মধ্যে মনে পড়লে দুই এক হাজার টাকা পাঠাচ্ছে, কেউ বাবা-মাকে বৃদ্ধাআশ্রমে রেখে দিচ্ছে অথবা রাস্তায় ফেলে রেখে যাচ্ছে।
একটা সময় ছিল এক টাকা দুই টাকা চাঁদা তুলে ফুটবল কিনে পাড়া মহল্লায় সমবয়সী ছেলেরা খেলায় মত্ত থাকত। আর এখন একটা ছেলেই পাঁচটা বল ক্রয় করলেও সমবয়সী এগার জন জোগাড় করা কষ্ঠসাধ্য, কিন্তু কাউকে চাপাতি বা রামদা দিয়ে কোপাতে গেলে এগার জন খেলোয়াড় জোগাড় হয়ে যায় খুব সহজে। গ্রুপে মেসেজ দিয়ে এগারো জন নিয়ে কাউকে পেটানো যায় সহজে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে ধর্মীয় মৌলবাদকে উসকে দিয়ে হাজার হাজার লোক নিয়ে অন্যের দোকান, বসত বাড়ি, উপাসনালয়, নিরীহ মানুষ গুলিকে নির্যাতন করতে জোগাড় করা যায় সহজে। যেমন তৈরি হচ্ছে শর্টকাট জেনারেশন তেমনি তৈরি হচ্ছে এলাকায় ত্রাশ সৃষ্টি করা কিশোর গ্যাং কালচার।
অত্যাধুনিক যুগে সামাজিক পেক্ষাপটে আমূল পরিবর্তন হয়েছে। পরিবার ও সমাজে আধুনিকতার চরম বিকাশ ঘটেছে। এনালগের পরিবর্তে ডিজিটালাইজেশনের বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। আবহমান বাংলার চিরাচরিত সংস্কৃতির জায়গায় কিছু অপসংস্কৃতির চর্চার আগমন ঘটেছে। সামাজিক পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের মনেরও পরিবর্তন হচ্ছে। যৌথ পরিবার প্রথার পরিবর্তে একক পরিবারে একা ভোগ করার মানসিকতা হচ্ছে। কোমল মতি শিশুটিকে স্কুলে নেওয়ার সময় মাকে বলতে শোনা যায় আজকেও যেন টিফিন বন্ধুদের দিয়ে দিও না। যে সমাজে এক সময় আশি বছরের বয়ষ্ক প্রবীন ব্যক্তি ছিল বাড়ির অভিভাবক বর্তমানে সেই প্রবীন ব্যাক্তিকে সংসারের কোন্ ছেলে খেতে দিবে, কয় দিন বা কয় মাস খেতে দিবে ভাগ করা হয়, কেউ কেউ আবার খোঁজ খবরও নেয় না, সম্মান শ্রদ্ধাতো পরের কথা। সমাজের অসহিষ্ণুতা এমন পর্যায় পৌঁছে গেছে, জন্মদাতা মা সন্তানদের বিষ খাইয়ে মেরে নিজে আতœহত্যা করছে, আস্থা বিশ্বাসের মাথা খেয়ে অকাতরে গভীর বিশ্বাসে পাশে ঘুমানো স্বামীকে স্ত্রী ব্যাট দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলছে। পরকীয়ার কারনে কেউ, স্ত্রী সন্তানকে নির্মম ভাবে হত্যা করছে কেউ আবার স্বামী সন্তানকে হত্যা করে প্রেমিক পুরুষের সাথে নতুন ভাবে ঘর সাজিয়ে সুখে থাকার স্বপ্ন দেখে। একদিকে কেউ অর্থ অভাবে ধুকে ধুকে মরছে অন্যদিকে দূর্নীতি করা ক্যাসিনো আর জুয়ার ক্লাবের কোটি কোটি টাকা আলমারী , সিন্ধুক ও বস্তায় ভরে রাখছে।
রিফাত, বিশ্বজিৎ এর মতো লোক গুলিকে শত শত মানুষের মাঝে রামদা-চাপাতি দিয়ে কোপালেও কেউ এগিয়ে আসেনা হায়েনার দলের হাত থেকে বাঁচাতে। কি অসহিষ্ণু সমাজ ব্যবস্থায় আমরা আছি! আমাদের মানসিকতা কোথায় পৌঁছে গেছে ! এমন ভাবে কোপাতে পারে প্রকাশ্য দিবালোকে! তাদের আতœাটা একটি বারের জন্য কেঁপে উঠে না ? অপরাধ করে পার পেয়ে গিয়ে আরো বেশি অপরাধী হয়ে উঠে এটা তারই বহিৃঃপ্রকাশ। আবার অপরাধ করে ঘুরে বেড়ালেও রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের মানুষ গুলি খুজে পায় না সহজে। একজন মাকে চার বছরের শিশুর সামনে গুজব রটিয়ে গন পিটুনি দিয়ে মেরে ফেলছে। চার বছরের মেয়েকে ধর্ষন করছে , মাদ্রাসার হুজুর ছাত্রীদের ভোগ করছে , স্কুলের শিক্ষক নীতি নৈতিকতা হারিয়ে কমপক্ষে বিশ ছাত্রীকে ধর্ষন করেছে ভিডিও করেছে আবার কোন কোন ছাত্রীর মাকেও ছাড় দিচ্ছে না এই নরপশুরা। ক্যামেরার ফ্রেমে আটকা পড়ে রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের কেউ কেউ লাল বাতি জ্বালিয়ে খাস কামরায় খাট বসিয়ে নীতি নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে বাড়িতে সুন্দরী বউ রেখে অধিনস্তদের সাথে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়েছে, জানিনা ক্যামেরার বাহিরে এমন খেলায় কত জন কর্তাব্যক্তি মর্ত্ত আছেন। আবার কেউ কেউ নিয়মিত অনৈতিক সম্পর্কের ফাঁদে ফেলে উর্ধতনদের কবজা করে, কার্য সম্পাদন করে, জীবনের রং পরিবর্তন করে নিচ্ছে। বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানে যেখানে দেশের সেরা মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী পড়াশুনা করতে আসে সেখানে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয় সহপাঠিকে। পড়াশুনা বাদ দিয়ে ব্যস্ত থাকে অপরাজনীতি , টেন্ডারবাজি ও র‌্যাগিং কালচার নিয়ে । বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানীয় অভিভাবক ভিসি মহোদয়ের পদবীকে কেউ কেউ করে ফেলেছেন ভোগ-বিলাস আর ক্ষমতার আসন। কেউ আবার সন্তান সমতূল্য ছাত্র নেতাদের ঈদের বকশিস হিসেবে দিয়েছেন লক্ষ লক্ষ টাকা, কি অসহিষ্ণু ব্যবস্থা !
সমাজের অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে, মাথাপিচু আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, পোষাকে পরিবর্তন হচ্ছে, চারিপাশে ডিজিটালাইজেশন হচ্ছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থা বানিজ্য হয়ে গেছে , বেঁচে থাকার সেবা খাতের চিকিৎসা ব্যবস্থা দিন দিন মানুষের কাছে আতংকের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন জেনারেশন শিষ্টাচার, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ, নীতিনৈতিকতা থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে। নৈতিক স্খলন হয়েছে জেলা প্রশাসক, পুলিশের ডিআইজি, থানার ওসি , মাদ্রাসার অধ্যক্ষের। সমাজ , জাতি, রাষ্ট্র যাদের দিকে চেয়ে থাকে তাদেরই যখন নৈতিক স্খলন হয় তখন সাধারন মানুষের আর ন্যায় বিচার বা শেষ আশ্রয় বলে কিছুই থাকে না। বিবেকহীন আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা প্রয়োগে মুমূর্ষু রুগি ফেরির উপর এমবুলেন্সে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছে তবুও প্রভাবশালীদের বিবেক জাগ্রত হয় না। নিষ্ঠুর পরিহাস সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত ব্যক্তিদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে নির্লজ্জের মতো হো হো করে হেসে উঠেন মন্ত্রী মহোদয়। আমরা এমন একটা যায়গায় পৌঁছে গেছি কাউকে কুপিয়ে মারলে দাঁড়িয়ে দেখি, ডুবে মরলে ভিডিও করি, আগুন ধরলে সেলফি তুলি, ফেসবুক লাইভে এসে হত্যার হুমকি দিই বা আতœহত্যা করি। একটানা পাঁচ থেকে ছয় ঘন্টা এক সাথে পাশাপাশি বসে বাসে বা ট্রেনে ভ্রমন করলেও কেউ কারো সাথে গল্প বা কথা বলার প্রয়োজন বোধ করছি না । সবাই যে যার মতো ব্যস্ত দুই ইঞ্চি চওড়া পাঁচ ইঞ্চি লম্বা ডিসপ্লেতে ফেসবুক দেখে, চ্যাট করে নয়তো গেইম খেলে। দিন দিন হয়ে উঠছে কি বিচিত্র পরিবেশ! কি বিচিত্র মানুষ! কি অসহিষ্ণু সমাজ !
(লেখক- নিপুল কুমার বিশ্বাস, মতামত একান্ত লেখকের নিজস্ব)

 

পাঠকের মন্তব্য

লাইভ

টপ