‘ছেলেধরা’র বিষয়টি একেবারেই গুজব'

কাউকে সন্দেহ হলে থানা পুলিশকে অবহিত করুন-ওসি  সোহরাওয়ার্দী 

ইউনুস আলী ফাইম ০১:২১, ২২ জুলাই ২০১৯

সম্প্রতি দেশের বেশ কিছু এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে দেখা যাচ্ছে।  পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে’ বলে একটি গুজব ছড়ানোকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে কয়েকজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।  

নওগাঁর মান্দা উপজেলায় ছেলেধরা সন্দেহে ছয় ব্যক্তিকে গণপিটুনি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পরে পুলিশ ওই ছয় ব্যক্তিকে উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নেয়। রোববার সকালে উপজেলার বুড়িদহ গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
গণপিটুনির শিকার ছয় ব্যক্তি হলেন নওগাঁ সদর উপজেলার খাগড়া গ্রামের সাদ্দাম হোসেন, তসলিম হোসেন, সাইফুল ইসলাম, আবদুল মজিদ আকন্দ ও আনিছুর রহমান এবং সদর উপজেলার ফারতপুর গ্রামের রেজাউল করিম।
স্থানীয় বাসিন্দা ও থানা-পুলিশ সূত্রে জানা গেছে,  এই ছয়জন উপজেলার বুড়িদহ গ্রামের রণজিৎ কুমার চৌধুরীর পুকুরে চুক্তিভিত্তিক মাছ ধরতে যান। পুকুরের মালিকের সঙ্গে তাঁদের চুক্তি ছিল যে তাঁরা শুধু ছোট মাছ ধরবেন। কিন্তু তাঁরা কয়েকটি বড় মাছও ধরে ফেলেন। এ নিয়ে তাঁদের সঙ্গে পুকুরমালিকের কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে পুকুরের মালিক ও গ্রামের লোকজন ছয় জেলেকে মারধর করতে শুরু করেন। তাঁরা নিজেদের বাঁচাতে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় গ্রামের লোকজন ‘ছেলেধরা’ বলে চিৎকার করতে শুরু করলে আরও লোকজন ছুটে গিয়ে প্রথমে সাদ্দাম হোসেন নামের এক জেলেকে আটক করেন। ‘ছেলেধরা’ পালিয়ে গেছে খবর রটে গেলে পাশের খুদিয়াডাঙ্গা গ্রামের লোকজন অন্য পাঁচজন জেলেকে আটক করে পিটুনি দেয়।
রাজশাহী অঞ্চলে ‘ছেলেধরা গুজব’ ডালপালা আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় জনমনে রীতিমত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ছেলেধরা সন্দেহে গত দুদিনে অন্তত ১২ ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়েছে স্থানীয়রা।

এদিকে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে দেশের বেশ কিছু এলাকায় বিভিন্ন উপজেলায় থানা পুলিশকে মাইকিং করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

রাজশাহীর মহানগরীর বিনোদপুর মিজানের মোড় এলাকায় রবিবার দুপুরে ছেলেধরা সন্দেহে তিন ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়েছে এলাকাবাসী। এ সময় তাদের বহনকারী গাড়িটি ভাঙচুর করেছে এলাকাবাসী। পুলিশ গিয়ে এলাকাবাসীকে শান্ত করে ওই তিন ব্যক্তিকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। পুলিশ জানায়, ওই তিন ব্যক্তি একটি কোম্পানির চিপস প্রচারের জন্য শিশুদের খাওয়াতে গেলে হঠাৎ স্থানীয় লোকজনের মধ্যে ছেলেধরা সন্দেহ জাগে। এলাকাবাসী জিজ্ঞেস করে, আপনারা কোন কোম্পানি থেকে এসেছেন। আপনাদের পরিচয়পত্র কোথায়? এ সময় তারা পরিচয়পত্র দেখাতে ব্যর্থ হলে এলাকাবাসী ছেলেধরা সন্দেহে তাদের গণপিটুনি দেয়।

শনিবার বিকেলে রাজশাহীর তানোরে ছেলেধরা সন্দেহে দুই যুবককে গণপিটুনি দিয়ে প্রশাসনের হাতে তুলে দিয়েছে গ্রামবাসী। এতে তারা আহত হলে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। কলমা ইউনিয়নের বহড়া ও কামারগাঁ ইউনিয়নের কচুয়া গ্রামে এসব ঘটনা ঘটে। তানোর থানার কলমা ইউনিয়নের বহড়া থেকে ছেলেধরা সন্দেহে লুৎফর রহমান (২৮) নামের এক যুবককে গণপিটুনি দিয়ে র‌্যাব-৫ এর হাতে তুলে দিয়েছে গ্রামবাসী। কামারগাঁ ইউনিয়নের কচুয়া গ্রামে মনোয়ারুল (২৯) নামের এক যুবককে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছে। তার বাড়ি রাজশাহীর মোহনপুরে।

ছেলেধরা সন্দেহে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে এক প্রতিবন্ধী নারীকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছে মহল্লাবাসী। গোদাগাড়ী পৌরসভার শ্রীমন্তপুর মহল্লার এ ঘটনার পর পুলিশ অবশ্য ওই নারীকে ছেড়ে দিয়েছে। শনিবার দুপুরে পাবনার চাটমোহরে উপজেলার বনগ্রাম বাজারে ছেলেধরা সন্দেহে যুবক রাসেল রানাকে (৩২) গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছে এলাকাবাসী।

সম্প্রতি দেশের বেশ কিছু এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনায় নওগাঁ সদর মডেল থানা ওসি সোহরাওয়ার্দী হোসেন বলেন, কথিত ‘ছেলেধরা’র বিষয়টি একেবারেই গুজব। গুজব ছড়ানো এবং গুজবে কান দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। কাউকে ছেলেধরা সন্দেহ হলে গণপিটুনি না দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দিন।

অত্যন্ত পরিতাপের সাথে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, সারাদেশে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে নিরীহ মানুষদের জীবন আজ হুমকির মুখে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে প্রাণহানিরও ঘটনা ঘটছে। এ ব্যাপারে সর্বসাধারণদের সতর্কতা অবলম্বন করে, নিকটস্থ থানায় বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে জরুরী ভিত্তিতে অবহিত করার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ করেছেন । ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়ে এ পর্যন্ত যতগুলো ঘটনা ঘটেছে, পুলিশ প্রত্যেকটি ঘটনা আমলে নিয়ে তদন্তে নেমেছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে হত্যা ফৌজধারী অপরাধ।

তিনি আরও বলেন, কথিত ছেলেধরা আতঙ্কে কোনো শিশুর যেন স্কুলে যাওয়া বন্ধ না হয়। কারও আচরণ সন্দেহজনক হলে দ্রুত পুলিশকে অবহিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে ‘ছেলেধরা’ গুজবে কান না দেয়ার পরামর্শ দিয়ে নওগাঁ জেলার পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন বলেন, ‘এটা পুরোপুরি গুজব। এ ধরনের গুজবে কাউকে কান না দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।’ কোনো মহল হয়তো অসৎ উদ্দেশ্যে এ ধরনের গুজব ছড়িয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে।

পাঠকের মন্তব্য

লাইভ

টপ