গল্প নয় সত্যি——-

অনুপা দেওয়ানজী ০৬:১৬, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

আমার মায়ের লেখা…সত্য ঘটনা গল্পের আকারে লেখা।

সময়টা সত্তর দশকের শুরুতে। আমার বাবা তখন পেট্রোপাকিস্তানের ফিল্ড ইন্জিনিয়ার ছিলেন। বেলুচিস্তান থেকে সবে সিলেটের হরিপুর গ্যাস ফিল্ডে বদলী হয়ে এসেছেন, গল্পটা সেই সময়ের।

——————- অফিস থেকে ঘরে ফিরে এক বিকেলে আমার কর্তা খুব হাসিমুখে বললো প্ল্যান্ট অপারেটর বিশ্বাসের কাছ থেকে আজ একটা গরু কিনে ফেললাম বুঝলে?গরুটা তিন সেরের মতো দুধ দেয়। দুধও নাকি খুব ঘন আর মিষ্টি।

কথাটা শুনেই আমি হাঁ করে কর্তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ গরু কিনেছো মানে?’ গরু দিয়ে কি হবে?
– গরু দিয়ে কি হবে আবার? দুধ খাবে সবাই।
– দুধ খায় সে আমিও জানি।তাই বলে তিনসের দুধ খাবে কে?তাছাড়া দুধ তো আমরা মালির কাছ থেকে নিই।একসেরেই আমাদের দিব্যি চলে যায়।তার গরুর দুধও বেশ ভালো।
বুদ্ধিটা তোমাকে কে দিলো শুনি?
-বিশ্বাস নিজেই দিয়েছে।
-বিশ্বাস বুদ্ধি দিলো আর তুমিও তার বুদ্ধিতে কিনতে রাজি হয়ে গেলে?গরুটা সত্যি সত্যি তিন সের দুধ তো নাও দিতে পারে।
-দেবেনা কেন? বিশ্বাসের নিজের গরু।সে নিজেই দুধ দোয়।
-নিজের গরুটা এত ভালো হলে সে বিক্রি করছে কেন?
-সে নাকি আরেকটা গরু কিনেছে তাই?
কর্তার কথা শুনে আমি তখন হাসবো না কাঁদবো?সে আরেকটা গরু কিনেছে বলে আমাকে তার গরুটা গছাবে কেন?
আমি কর্তাকে বললাম বিশ্বাস অত ভালো গরুটা নিজের জন্যে না রেখে আরেকটা গরু যখন কিনেছে নিশ্চয় তার মধ্যে কোন একটা ব্যাপার আছে।
– তোমার সব তাতেই সন্দেহ। ব্যাপার ট্যাপার কিছু নেই। এত ভালো গরুটা সে অন্য কারো কাছে বিক্রি করতে চায় না বলেই আমাকে অনুরোধ করেছে।
আমিও ভাবলাম বিশ্বাস তো আমাদের নিজের লোকের মতো। নিয়েই নিই গরুটা।দুধ তো আমাদের লাগেই।
– দুধ লাগবে বলে গরু একটা কিনলেই তো হলনা ওটা থাকবেই বা কোথায়? দেখাশোনা করার জন্যেও তো একটা রাখাল চাই।
– ও নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না।গরুটা বিশ্বাসের গরুর সাথে তার গোয়ালেই থাকবে। ওদের রাখাল ছেলেই ওটার যত্ন নেবে।তার বেতন আর গরুর জন্যে যা খরচ হয় তা দিয়ে দিলেই হবে। শুধু তাই নয় রোজ সকালে বিশ্বাস দুধ দুইয়ে তোমার ঘরেও এনে দেবে।এত সুবিধা গুলি কোথায় পাবে তুমি?
মালিকে বোল ওর দুধের আর দরকার হবে না।
আমি মালিকে যখন বললাম আমরা বিশ্বাসের গরুটা কিনেছি তার দুধের আর দরকার হবে না। বুড়ো মালিটা আমার কথা শুনেই আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো।”গরু খিনছইন ইতা তো বালা খতা মেমসাব। খিন্তু বিশ্বাসবাবুর গরু খিতার লাগি খিনলা? ই গরুতো এক্কেরে বুড়া গরু মেমসাব।সাবে আমারে খইলেই পারতো।আমি দেইখ্যা হুইন্যা ভালা একখান গরু খিইন্যা দিতে পারতাম।
আমি কর্তাকে বললাম গরুটা শুনেছি বুড়ো গরু।বিশ্বাস ভুজুংভাজুং দিয়ে তোমাকে ওটা গছিয়েছে।
আমার কর্তা বললো বুড়ো গরু কে বললো তোমাকে?বুড়ো গরু হলে সে আমার কাছে বিক্রি করতো নাকি?
আমি মালির কথা না বলে তাকে বললাম বিশ্বাসকে বোল কাল দুধ দিয়ে গেলে গরুটাও যেন আমাকে দেখিয়ে নিয়ে যায়।
আমার কর্তা হাসতে হাসতে আমাকে বললো,’গরু দেখে তুমি বুঝবে নাকি ওটা বুড়ো না জোয়ান? গরু বিশারদ হলে কবে থেকে?’
-তুমি দেখেছো?
-না।
-না দেখেই গরু কিনে ফেললে যে বড়? তুমি তো দেখছি আমার চেয়েও বিশারদ।
-আমি বিশ্বাসকে অবিশ্বাস করতে পারিনা।গরুটা নিশ্চয় ভালো হবে।সে আমাকে ঠকাবে না।
পরদিন সকাল সাতটায় কর্তা ব্রেকফাস্ট করেই অফিসে চলে যাবার পরে আমি তাকে বিদায় দিয়ে বাংলোর বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি।মেয়ে বিপাশা বারান্দায় ছুটোছুটি করছে।ছেলে তখনো ঘুম থেকে ওঠেনি।
দূরে দেখা যাচ্ছে সীমান্তের ধোঁয়া ধোঁয়া পাহাড়। চারিদিকে সবুজ আর সবুজ।শীত যাই যাই করলেও তার প্রভাব এতটুকু কমে নি।কুয়াশা জাঁকিয়ে থাকে অনেক বেলা অব্দি।প্রায়ই রোদের মুখ বেলা দশটার আগে ধরা না দিলেও সেদিন শীত তেমন লাগছিলো না।
এমন সময় বাবুর্চি আলাউদ্দিন এসে বললো,’
মেমসাব বিশ্বাস বাবু গরু লইয়া আইতাছইন।’
আমি ব্যাকইয়ার্ড পেরিয়ে গিয়ে দেখি সত্যিই টিলা বেয়ে প্ল্যান্ট অপারেটর বিশ্বাস আর তার রাখাল একটা লাল রঙের গরু নিয়ে উঠে আসছে।রাখালের হাতে একটা এলুমিনিয়ামের জগ।তাতে নিশ্চয় দুধ।টিলা পেরিয়ে এসেই বিশ্বাস এলুমিনিয়ামের জগটা আলাউদ্দিনের হাতে তুলে দিয়ে আমাকে নমস্কার জানিয়ে বললো “মামী আপনি নাকি গরুটা দেখতে চেয়েছেন? তাই আপনাকে গরুটা দেখাতে নিয়ে এলাম।”

সত্যি বলতে কি গরু বুড়ো বা জোয়ান কিনা সেই বয়সে আমি মোটেই বুঝতে পারতাম না।ছোট বেলায় আমাদের বাড়িতে দুরকম গরুর গোয়াল ছিলো।একটাতে হালের বলদ যেগুলি সব সময়েই বাঁধা থাকতো। বাড়ির কামলারা ছাড়া ওদের ছোঁবার সাধ্যি কারুরই ছিলো না।আমরা ভয়েও ওদিকে যেতাম না।
আরেকটা ছিলো গাইগরুর গোয়াল।সেই গোয়াল দেখাশোনা করতো ক্ষীরোদ আর পাঁচকড়ি নামে আধবয়েসী দুজন লোক।সেই গোয়ালেও কখনও আমি গেলে ক্ষীরোদ তার চোখ দুটি বড় বড় করে গাল ফুলিয়ে আমাকে ভয় দেখাতো। আমি ভয়েও তাই ওই গোয়ালও মাড়াতাম না।
বিশ্বাস চট্টগ্রামের লোক।সেই সূত্রে কি ভেবে যে আমাকে মামী বলে ডাকতো তা আমার জানা হয় নি।
সে আমাকে বললো,’মামী গরুটা যাকে বলে খুব সুলক্ষণা গরু।এইযে দেখেন ওর কপালে একটা চাঁদ আঁকা রয়েছে।আমরা তাই ওর নাম দিয়েছি চাঁদকপালি’।
আমি বিশ্বাসের কথায় গরুটার দিকে তাকিয়ে দেখি সত্যিই ওটার কপালে সাদা রঙের একট বাঁকা চাঁদ আঁকা রয়েছে।
সব্জির ক্ষেত থেকে ততক্ষণে মালি উঠে এসে নীরবে দাঁড়িয়ে আমাদের কথা শুনছিলো। তার অভিজ্ঞ চোখ ঠিকই বুঝতে পেরেছে আমি গরু সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ।সে আর থাকতে না পেরে বলে উঠলো, ‘ইতা চাঁন্দে উন্দে খিতা অইবো গরুডার খিন্তুখ বয়স অইছে।’
বিশ্বাস বললো,’ হ তোমারে কইছে বয়স অইছে।’
এর মধ্যে কথায় কথায় বিশ্বাস আমার মেয়েটাকে পটিয়ে ফেলেছে।সে তাকে বললো তোমার জন্যেই চাঁদ কপালি গরুটা নিয়ে এসেছি। ওর পিঠে চড়বে?এই বলে মেয়েকে কোলে নিয়ে গরুটার পিঠের ওপর বসিয়ে দিলো।
সবে পাকিস্তান থেকে এসেছি তখন।আমার মেয়ে উটে চড়ে বেড়াবার কথা এতটুকু ভোলেনি।গরুর পিঠে চড়ে মহাখুশি হয়ে সে বলে উঠলো,’ উটের চেয়ে চাঁদ কপালি গরুটা বেশি সুন্দর মা।’
গরুটাকে দেখেই আমার মেয়ে তাকে রীতিমতো ভালোবেসে ফেললো।
বিশ্বাস মেয়েকে গরুর পিঠ থেকে নামিয়ে দিতে দিতে আমাকে বললো,’মামী আপনি এই চাঁদ কপালি গরুর দুধ একবার খেলেই বুঝবেন দুধটা কত গাঢ় আর মিষ্টি।
এজন্যেই মামাকে বলেছি গরুটা কিনতে।মামা না কিনলেও আমি গরুটা অন্য কারো কাছে বিক্রি করতাম না।’
বিশ্বাস চলে গেলে বুড়ো মালি নিজের মনে গাছের গোড়ায় নিড়ানি দিতে দিতে বলতে লাগলো,” হ বুইড়া গরুর দুধ মিডা তো অইবই।গরুডা বাঁইচবোই বা আর খয় দিন?
ঘরে এসে দুধটা জ্বাল দেবার পরে দেখি বিশ্বাসের কথা মিথ্যে নয়।একবার জ্বাল দিতেই দিব্যি পুরু সরের আস্তরণ পরেছে। সরের ওপর হাত রাখলে সেই সর ভাঙছে না বা হাতে দুধও লাগছে না।
কিন্তু তাই বলে তিন সের দুধ রোজ রোজ খাবে কে?আমি কর্তার ওপর রেগে গিয়ে মনে মনে ভাবছিলাম খামোকা তার একটা গরু কেনার কি দরকার ছিলো? এত দুধ নিয়ে এখন আমি করবো কি?।সীমান্তবর্তী সেই পাহাড়ি জায়গাটিতে যোগাযোগ ব্যবস্থার তেমন উন্নতি তখনও হয়নি বলে মাছ,দুধ,সব্জি সব কিছুই ছিলো খাঁটি আর একেবারেই সস্তা।
কাঁটাতারে ঘেরা অফিসের বিশাল সংরক্ষিত জায়গা জুড়ে কচি কচি সবুজ ঘাসে ছেয়ে থাকে। সেই ঘাসই শ্রমিকরা কেটে নিয়ে যায় নিজেদের জন্যে।আমাদের চাঁদকপালি গরুটাও নাকি সেই ঘাসই খায়।
সেদিন কর্তা অফিস থেকে ফিরলে আমি তাকে যেই চায়ের বদলে দুধ খাবে নাকি জিজ্ঞেস করলাম সে আমার দিকে এমন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো যেন আমি কোন হাসির কথা বলেছি।আমাকে সে বললো
– দুধ! দুধ আমার সহ্য হয় না।চা দাও।
– তাহলে এত দুধ খাবে কে?
– আমার জন্যে নয় তোমরা খাবে বলেই তো গরুটা কিনেছি।
– ছেলের বয়েস মাত্র দুমাস ও এখনই গরুর দুধ খাবে কি? মেয়েটাও দুধ দেখলেই নাক সিঁটকায়।জোর করে খাওয়াতে হয়।
মালির দুধেই তো দিব্যি চলছিলো।খামোকা গরু কেনার কোন দরকার ছিলো তোমার?
কর্তা তো বলেই খালাস।এদিকে রোজ রোজ তিনসের দুধ নিয়ে আমি পড়লাম মহাবিপদে।
বিয়ের আগে মা চুলার ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেন নি।সেই আমি সরদাগা ঘি তুলবো বলে দুধের সর জমাতে শুরু করলাম ।
এরপর শুরু হল দুধ নিয়ে আমার নানা পরীক্ষা নিরিক্ষা।
পায়েস,দই,পুডিং, হালুয়া,ক্ষীর,ছানা,সন্দেশ,লেডিকেনি ইত্যাদিতে একে একে হাত পাকিয়ে ক্ষীরের সন্দেশ বানাতে শুরু করলাম। সেই সন্দেশ বেশ কিছুদিন রাখা যায় বলে এস্কর্টকে দিয়ে আমার মেজো জায়ের জন্যে পাঠিয়ে দিই মাঝে মাঝে।
অতিথিরা আসলে খেয়ে তারিফ করেন।
কিছুদিন পর ইচ্ছে হল দই মন্থন করে কিভাবে মাখন তুলতে হয় তাও আমাকে শিখতে হবে।মালিকে বলতেই সে আমার জন্যে একটা কালো মটকা কিনে এনে দিলো । বাঁশ দিয়ে ভারি সুন্দর মন্থন দণ্ডও বানিয়ে দিলো সেই সাথে একটা দড়িও পাকিয়ে দিলো।শুধু তাই নয় দই মন্থন করে কিভাবে মাখন তুলতে হয় তার বউ এসে আমাকে শিখিয়েও দিয়ে গেলো।
প্রথম প্রথম পারতাম না।মন্থন দণ্ডটাকে ঘোরাতে কিন্তু একসময়ে ঠিকই পারলাম।
আমার কর্তা একদিন অফিস থেকে এসে দই মন্থন করতে দেখে হাসতে হাসতে আমাকে রাধারাণী বলে খেপাতে শুরু করলো।
দই মন্থন করে মাখন তো উঠাই কিন্ত ঘোলগুলি নিয়ে বিপাকে পড়তাম।এত ঘোল খাবে কে? বাধ্য হয়ে ড্রেনে ফেলে দিতাম।সেই ঘোল নহর তুলে ড্রেন দিয়ে বয়ে নিচের সব্জি ক্ষেতে গিয়ে পড়তো।এভাবেই বেশ কেটে যাচ্ছিলো দিনগুলি। বিশ্বাসের অল্পবয়সী রাখাল ছেলেটা রোজ সকালে আমাদের ঘরে দুধ দিয়ে যায়।
কিছুদিন পরেই মনে হল চাঁদকপালি গরুর দুধটা আর আগের মতো নেই। কিছুটা পানসে হয়ে গেছে। আগের মতো সর পড়েনা বা মাখনও ওঠে না।আমি এ নিয়ে বিশ্বাসকে কিছু না বললেও মনে ঠিকই একটা খটকা লাগলো।
পরে জানলাম বিশ্বাস ওর গরুর দুধ আর চাঁদকপালি গরুর দুধ একসাথে মিশিয়ে তারপর সেখান থেকে তিনসের দুধ আমাকে মেপে দেয়।
তবে দুধ নিয়ে পরিক্ষা নিরিক্ষাটা আমারও আর আগের মতো ভালো লাগছিলো না।আসলে নূতন কোন কিছু শেখার জন্যে প্রথমদিকে যে আগ্রহ থাকে শেখা হয়ে গেলে সেই আগ্রহটা হয়তো থিতিয়ে আসে। আমারও একসময় তাই হল।অতিথি আসলে বা প্রয়োজন হলে কিছু বানাই নয়তো বানাই না।
কর্তা তাই গরুটাকে টেংরা টিলা থেকে সিলেটের হরিপুর গ্যাসফিল্ডে আমার মেজো ভাশুরের কাছে পাঠিয়ে দেবে বলে মনস্থ করলো।
সুরমা নদীর বুকে গাধা বোটে পাড়ি দিয়ে চাঁদকপালি তার বাচ্চাকে নিয়ে হরিপুর যাত্রা করলো।
পাঁচ ঘণ্টা পরে ছাতকে নেমে ট্রাকে চড়ে হরিপুরের এক কুলিবাড়িতে এসে ট্রাকটা থামলো।
খান টি এস্টেট আর হরিপুর গ্যাস ফিল্ডের মাঝামাঝি একটা টিলায় সেই কুলির বাড়ি।
ভাশুর তাকেই গরুটা দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছেন।
তার বউ রোজ দুধ দুইয়ে ভাশুরের ঘরে পৌঁছে দিয়ে যায়।
আমি হরিপুরে বেড়াতে গেলে ভাশুরের বাংলোর বারান্দায় সকালে দাঁড়ালেই দেখি কুলির বউটা মাথায় ঝকঝকে পেতলের কলসিতে করে টিলা বেয়ে নেমে আসে চাঁদকপালির দুধ নিয়ে। তাকে দেখলেই আমার তারাশঙ্করের ‘কবি’র ঠাকুরঝির কথা মনে পড়ে যেতো।
চাঁদকপালির দুধ ভাশুরের বাসায় ছেলেমেয়েরা সবাই তৃপ্তি করেই খায়।আমার জাও শেষ পাতে দুধ খেতে ভালোবাসতো।
মজার কথা হচ্ছে ভাশুরের প্রতিবেশি একজন অবিবাহিত ইঞ্জিনিয়ার তাঁর বাসায় বেড়াতে এসে চাঁদ কপালির দুধ খেয়ে তাঁর রোজের আধসের দুধের সাথে চাঁদকপালির দুধটা বদলে দিতে অনুরোধ করে বসলেন।
আমার সদাশয় ভাশুর তাঁর সেই অনুরোধ রেখেছিলেন।
এদিকে দেশে তখন বঙ্গবন্ধুর জোর আন্দোলন চলছে। তার মধ্যেই একদিন আমার কর্তা হঠাৎ বলল,”চল চট্টগ্রাম থেকে কিছুদিন বেরিয়ে আসি।
ছোট বাচ্চা নিয়ে সেই সময়ে আমার যাবার খুব একটা ইচ্ছে ছিলো না। বললাম কিছুদিন আগে পাকিস্তান থেকে এসেই চট্টগ্রাম থেকে বেরিয়ে এলাম কিছুদিন পরেই যাই।
কিন্তু কর্তার উৎসাহ দেখে অগত্যা পনেরো দিনের জন্যে চট্টগ্রামের পথে রওয়ানা দিলাম।উ
চট্টগ্রামে বেড়াতে গিয়ে আমাদের আর সিলেটে ফেরা হলনা। টিকিট ছিলো পঁচিশে মার্চের।সেই কালো রাতেই পাকবাহিনীর কামানের বিকট গর্জনে ঘুমন্ত ঢাকা তখন মধ্যরাত্রিতে কেঁপে উঠেছে।একদিকে দিশেহারা মানুষ প্রাণের ভয়ে,সম্ভ্রমের ভয়ে আতঙ্কে পাগলের মতো যে যেদিকে পারে ছুটছে আর অন্যদিকে পাকবাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলছে রাজাকারদের লুটপাট।

আতঙ্কিত আমাদের বাড়ির সর্বস্বও এক রাতে লুট হয়ে গেলো।এমন কি বাড়ির গরু ছাগল গুলিও রাজাকাররা নিয়ে গেলো।
সম্পূর্ণ নিঃস্ব অবস্থায় আমরা ভারতের আগরতলাতে যখন শরণার্থী জীবন কাটাতে বাধ্য হলাম তখন আমার বাচ্চা দুটির মুখে দুধ তুলে দেবার মতো আমার ক্ষমতা ছিলো না।
ক্যাম্পে শিশুদের জন্যে রেডক্রস আর অক্সফামের গুঁড়ো দুধ জলে পাতলা করে গুলে জ্বাল দেয়া হত।আমার বাচ্চাদের জন্যে সেই দুধ পেতাম দুই মগ। দুধটুকু হাতে নিয়ে আমার দু চোখের জল অবিরল ধারায় গড়িয়ে পড়তো।চোখে ভাসতো রান্নাঘরের ড্রেনে ঢেলে দেয়া চাঁদকপালির দুধের দই থেকে ঘোলের স্রোতের কথা।
আমার মেজো ভাশুরও তখন আসামের শরণার্থী শিবিরে।
যুদ্ধ একসময়ে শেষ হল।আমরা শরণার্থী শিবির থেকে সিলেটে ফিরে এসে দেখি আমার আর আমার ভাশুরের কোয়ার্টার সম্পূর্ণ খালি।সবই লুট হয়ে গেছে। আমাদের সম্পূর্ণ সংরক্ষিত বাংলোর মালামাল লুটের সাথে পাকবাহিনী ও রোজ দুবেলা যে সব ভদ্র অফিসারদের সাথে ওঠাবসা,চলাফেরা করেছি তাঁদের মধ্যেও কেউ কেউ যুক্ত ছিলেন।
ক্যাম্প থেকে হরিপুরে আসার দুদিন পরেই দেখি সেই কুলিবউটি হাসিমুখে তার ঝকঝকে পেতলের কলসিতে করে দুধ নিয়ে এসেছে আমাদের জন্যে।আমাদের চাঁদকপালি গরুর দুধ।
আমি দুধের পাত্র হাতে অবাক চোখে সেই তথাকথিত অশিক্ষিত ও হতদরিদ্র কুলিবউটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।ইচ্ছে করলেই সে বলতে পারতো যুদ্ধে গরুটি মারা গেছে বা রাজাকাররা নিয়ে গেছে।
কিন্তু সে তা করে নি।
*সমাপ্ত*

পাঠকের মন্তব্য

লাইভ

টপ