ঢাকার রাস্তায় প্রায় উধাও গণপরিবহন, জন ভোগান্তি

মো: আসলাম দেওয়ান ১০:২০, ৯ এপ্রিল ২০১৯

রাজধানী ঢাকার রাস্তা থেকে প্রায় উধাও হয়ে গেছে গণপরিবহন। গত কয়েকদিনে গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোতে বাসের সংখ্যা নেমে এসেছে একেবারে আঙ্গুলের কড়ায়। ফলে নাগরিকরা গাড়ি না পেয়ে অবর্ণনীয় ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন। সকালে অফিসগামী মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও বাসের দেখা পাচ্ছেন না। যে কটা বাস মিলছে সেসব আগে থেকেই যাত্রীতে ঠাসা ওঠার জন্য চলছে হুড়োহুড়ি।

দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রীদের সে ভোগান্তির মাত্রা গিয়ে ঠেকেছে সীমাহীন পর্যায়ে। ফলে দীর্ঘ পথ হেঁটে বা রিকশায় যাতায়াত করতে হচ্ছে লোকজনকে। দিনের প্রায় সব সময়ের চিত্র একই। বাস না থাকায় শিশু, বৃদ্ধ, নারী, অসুস্থ ব্যক্তি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েছেন।

ভুক্তভোগী নাগরিকদের অভিযোগ, সম্প্রতি কয়েকটি সড়ক দুর্ঘটনায় ছাত্র বিক্ষোভ এবং বিশেষ ট্রাফিক সপ্তাহের পর বাস মালিকরা অধিকাংশ বাসই তুলে নিয়েছেন রাস্তা থেকে। রাজধানীতে বসবাসকারী দেড় কোটিরও বেশি নাগরিকের প্রধান ভরসা গণপরিবহনে।
মিরপুরের বাসিন্দা, কর্মজীবী নারী সাবিহা বলেন, প্রতিদিন সকালে মিরপুরের শেওড়াপাড়া থেকে গুলিস্তান হয়ে মাতিঝিলে যাই আবার বিকালে ফিরি। যাওয়া-আসার পথে মিরপুর-গুলিস্তান পর্যন্ত প্রতিদিন যেসব বাসে করে যাতায়াত করি সেসবের অধিকাংশই রাস্তায় চলছে না।

এ রুটের বিহঙ্গ, ইউনাইটেড, বিকল্প অটো সার্ভিস, স্বাধীন এক্সপ্রেস, খাজাবাবা, শিখর ও শিকড় পরিবহনের বাস সংখ্যায় একেবারে কমে গেছে। বাস পাওয়ার জন্য দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়। অনেকেই গুলিস্তান থেকে মিরপুর পর্যন্ত ভেঙে ভেঙে রিকশায় যাতায়াত করছে। এতে অতিরিক্ত অর্থ তো খরচ, ভোগান্তিও বাড়ছে।
শ্যামলী থেকে উত্তরাগামী রুটের যাত্রী শাহাদত হোসেন জানান, ভূঁইয়া, অগ্রদূত, বৈশাখী, আলিফ, তেঁতুলিয়া পরিবহনের বাস এ রুটে নিয়মিত চলাচল করত। কিন্তু হঠাৎ করেই কোম্পানীগুলির বৃহৎ সংখ্যক বাস উধাও হয়ে গেছে। হাতেগোনা কয়েকটি বাস চোখে পড়লেও সবকটি বাস গেটলক থাকে।  বাসের অপেক্ষায় থাকে শত শত যাত্রী।  দু’একটা বাস পাওয়াগেলেও তাতে ওঠার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা লেগে যায়।
আজিমপুর-নিউমার্কেট হয়ে আব্দুল্লাহপুরগামী রুটের যাত্রী আবদুল্লাহ মাসুম জানান, এ রুটের বাস এমনিতেই কম। ভিআইপি, বিকাশের মতো কয়েকটি পরিবহন চলাচল করে। কিন্তু এসব বাস মাত্র কয়েকটিতে এসে ঠেকেছে। বাস ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করে জানা গেছে, লাইসেন্স না থাকার কারণে তাদের কোম্পানির অধিকাংশ বাস গ্যারেজে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে।
সদরঘাট থেকে মিরপুর-গাবতলীর একই কথা। এ রুটের তানজিল, ৭ নন্বর বাস ও ট্রান্স সিলভার মতো পরিবহনগুলো সংখ্যায় এতটা কমে গেছে, বাস ধরার জন্য এখন যাত্রীদের হুড়োহুড়ি লেগে যায়। কেউ বাস পায়, কেউ পায় না। ঠাসাঠাসি করেও অপ্রতুল বাসে জায়গা হয় না মানুষের।
রোকেয়া সরণি হয়ে গুলিস্তান-আব্দুল্লাহপুর-গাজীপুর রুটে চলাচলকারী প্রধান পরিবহন সু-প্রভাত বন্ধ হয়ে গেছে। এখন চলছে অল্পসংখ্যক ভিক্টর পরিবহন। এ দুটি বাস না থাকায় এ রুটের যাত্রীরা এক মাস ধরে চরম ভোগান্তির মধ্যে রয়েছে। গাজীপুর হয়ে সায়েদাবাদ রুটের বাস তুরাগ পরিবহন এখানকার মানুষের এখন একমাত্র ভরসা। কিন্তু এসব বাসও সংখ্যায় এত অপ্রতুল যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও বাস পাওয়া যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ বলছেন, গত ১৯ মার্চ সু-প্রভাত পরিবহনের দুই বাসের রেশারেশিতে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী নিহতের ঘটনায় শিক্ষার্থী বিক্ষোভের পর থেকেই রাজধানীতে পরিবহন সংকট শুরু। সে সময় সরকার ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা রাস্তায় শৃঙ্খলা ফেরাতে বাস মালিক, ড্রাইভারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেন।

এর মধ্যে গত ৪ এপ্রিল গ্রিনলাইন পরিবহনে চাপা পড়ে পা হারানো রাসেল সরকারকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদানে সর্বোচ্চ আদালত কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। ক্ষতিপূরণ যাতে না দিতে হয় এ নিয়ে নানা পাঁয়তারা শুরু করেছেন পরিবহন মালিকরা। কেননা বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত পরিবার ক্ষতিপূরণ পাওয়ার নজির বিরল। মালিকদের আশঙ্কা রাসেলকে দিয়ে এ দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়ে গেলে আরও ভুক্তভোগী পরিবার আদালতের শরণাপন্ন হবে।
১০ এপ্রিলের মধ্যে গ্রিনলাইন কর্তৃপক্ষ রাসেল সরকারকে ক্ষতিপূরণের টাকা পরিশোধ না করলে ওই পরিবহনের সব গাড়ি জব্দ করে নিলামে বিক্রির কথাও বলেছেন আদালত।

আদালতের এ রায়ের প্রতিক্রিয়ায় গ্রিনলাইন পরিবহনের ম্যানেজার আবদুস সাত্তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘এই টাকা দিলে তো বাজারে একটা দাম নির্ধারণ হয়ে যাবে। মানুষ মারা গেলে কী হবে? এখন রোড অ্যাক্সিডেন্ট তো সারা পৃথিবীতে হচ্ছে।’
ক্ষতিপুরণ পরিশোধের ব্যপারে তিনি বলেন, ‘গ্রিন লাইন পরিবহন মালিককে তো অন্য মালিকরা এটা পরিশোধ করতে দেবেন না। তাদের সঙ্গে তো মালিক সমিতি আছে। তারা বলছে, যদি আপনি দেন তবে আমরা যারা একটা-দুইটা গাড়ি চালাই আমাদেরও এই টাকা দিতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এটা একটা জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হতে পারে। বিষয়টা এমনও হতে পারে, আমরা টাকাও দিয়ে দিতে পারি। অথবা নতুন ইস্যু হয়ে মোটরযান আইনও পরিবর্তন হতে পারে। আমাদের দুটি সমিতি আছে। সমিতিতে শাজাহান সাহেব, মশিউর রহমান রাঙ্গা ও ওসমান আলী সাহেবরা আছে। আমরা ৬৪ জেলার সমিতির নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি। এটা নিয়ে আলাপ-আলোচনাসহ অন্য সবকিছু হচ্ছে। এখন দেখা যাক কী হয়।
কোনো কোনো বাস মালিক ও ড্রাইভাররা অবশ্য বলছেন, বিশেষ ট্রাফিক সপ্তাহ শুরু হওয়ার পর থেকে লাইসেন্সবিহীন গাড়ি, রুট পারমিট ছাড়া গাড়ী তারা রাস্তায় নামাচ্ছেন না। যেসব গাড়ির ফিটনেস ও লাইসেন্স, বৈধ রুটপারমিট নেই সেসব গাড়ি বাসডিপোতে সারাই করা হচ্ছে। ফলে খুব অল্প সংখ্যক গাড়ি এখন রাস্তায় চলাচল করছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, জনভোগান্তি লাঘবের দায়িত্ব সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের। তারাই যে কোনো মূল্যে রাস্তায় পর্যাপ্ত গাড়ির ব্যবস্থা করবেন।

পাঠকের মন্তব্য

লাইভ

টপ