‘দ্যাখ, আমি কী করতে পারি’

অনলাইন ডেস্ক: ০৪:৫৩, ১১ অক্টোবর ২০১৯

যে শিক্ষার্থী বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) পড়ার সুযোগ পান, তিনি নিঃসন্দেহে মেধাবী। সদ্য কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে প্রবেশ করা এই মেধাটিকে বুয়েটে ভর্তি হওয়ার পর অনিবার্যভাবে র‍্যাগিং নামের নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এক বছর পর নির্যাতিত এই শিক্ষার্থীই জ্যেষ্ঠতা অর্জন করে বুয়েটের অলিখিত নিয়মমাফিক কনিষ্ঠ শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করার ‘অধিকারপ্রাপ্ত’ হন।

ছোটদের নির্যাতনের এই ‘অধিকারের’ সঙ্গে যদি যুক্ত হয় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের নেতা হওয়ার ক্ষমতা, সে তো দেবতা কর্তৃক দানবকে বর প্রদানের মতো। সামান্য বিচ্যুতি ঘটলেই দানবেরা চড় মেরে কনিষ্ঠদের নাক-কান ফাটিয়ে দেন। সঙ্গে চলে নানা কায়দার নির্যাতন। অলিখিত এই অধিকার ও ছাত্রলীগের নেতা হওয়ার ক্ষমতার দাপটের মিলিত শক্তিই ৬ অক্টোবর রাতে আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করেছে।

বৃহস্পতিবার এই প্রতিবেদকের সঙ্গে বুয়েটের ১৫ জন শিক্ষার্থীর মতবিনিময়ের সুযোগ হয়। পরিবেশ ও পরিস্থিতি নিয়ে তাঁরা এতটাই ভীত ও আতঙ্কিত যে, নিজেদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। এমনকি প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তৃতা দেওয়ার সময়ও তাঁরা নিজেদের নাম বলছেন না।

প্রতিবাদী এই শিক্ষার্থীদের ভাষ্যমতে, র‍্যাগিং ও ক্ষমতার দাপট বুয়েটের ছাত্রলীগের নেতাদের মানবিক গুণাবলি নষ্ট করে দিয়েছে। তাঁরা অন্যদের আঘাত করার মাধ্যমে যেন বলতে চান, ‘দ্যাখ আমি কে, আমি কী করতে পারি।’

আরও পড়ুন : এক আসামির ভয়ংকর বর্ণনা

শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, আবরার হত্যার অভিযোগে যাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাঁরাও এক সময়ে র‍্যাগিংয়ের শিকার হয়েছিলেন। জ্যেষ্ঠ হওয়া আর রাজনীতির ক্ষমতা পেয়ে অন্যদের নির্যাতন করার মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের মনের মধ্যে পুষে রাখা যন্ত্রণা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। খুন করেছেন আবরারকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মনোরোগবিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, কেউ যখন অত্যাচারিত বা লাঞ্ছিত হয়, তখন সে সম্পর্কিত ক্ষোভ তার মনের মধ্যে জমা থাকে এবং তার মধ্যে প্রতিশোধ স্পৃহা কাজ করে। অত্যাচারিত ব্যক্তি যখন ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে, তখন সে প্রতিশোধ নেয়। একই সঙ্গে সে ভাবে, নিজের সম্মান ও ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে অন্যদের ওপর অত্যাচার করতে হবে।

বাস্তবে এ ধরনের ব্যক্তিত্ব দেশকে ভালো কিছু দিতে পারে না। তাজুল ইসলাম বলেন, বুয়েটে যাঁরা র‍্যাগিংয়ের শিকার হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে মানসিক হীনম্মন্যতা কাজ করাটা স্বাভাবিক। বড় হয়ে তাঁরাও ছোটদের ওপর নির্যাতন চালান। তবে নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার মাধ্যমে এ ধরনের প্রতিহিংসামূলক মানসিক আচ্ছন্নতা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। আরও জরুরি হলো, আইন করে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে র‍্যাগিং নিষিদ্ধ করতে হবে।

মতের অমিল মানেই ‘ছাত্রশিবির ট্যাগ’

সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোনো আচরণ বা প্রকাশিত মত ক্ষমতাধরদের মনের মতো না হলেই ভয়ানক সব ঘটনা ঘটতে শুরু করে বলে জানান সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাঁরা বলেন, এসব ক্ষেত্রে বড়রা ছোটদের কান বরাবর চড় মেরে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়ে থাকেন। আর যাঁদের অপরাধ ‘গুরুতর’ বলে ধার্য হয়, তাঁদের শারীরিকভাবে নির্যাতন ও জখম করা হয়। তবে এসব সাজা ধার্য হওয়ার আগে ওই শিক্ষার্থীকে ‘ছাত্রশিবির’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। বুয়েটের শিক্ষার্থীদের ভাষায় ছাত্রশিবিরের ‘ট্যাগ’ লাগানো হয়। একই সঙ্গে নির্যাতিত শিক্ষার্থীদের মোবাইল, ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ কম্পিউটারসহ দামি জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

শিক্ষার্থীদের তথ্যমতে, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়ে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১৫ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী দাঈয়ান নাফিস প্রধান আন্দোলনকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। তখন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি গোলাম রাব্বানী পুলিশ নিয়ে শেরেবাংলা হলে গিয়েছিলেন। গিয়েই দাঈয়ানকে ‘শিবির’ বলে ঘোষণা দেন এবং শারীরিকভাবে নাজেহাল করেন। লাঞ্ছিত করার সেই দৃশ্য গোলাম রাব্বানী ভিডিওতে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেছিলেন। দাঈয়ানের মেকানিক্যাল যন্ত্রপাতির বক্সকে মোবাইল ফোনের ‘সিমবক্স’ বলে প্রচার করে বলেছিলেন, ছাত্রটি অসংখ্য সিম ব্যবহার করে নাশকতামূলক তৎপরতায় লিপ্ত ছিল। অথচ সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি, দাঈয়ানের পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, আবরার হত্যাকাণ্ডের দুদিন আগে ৪ অক্টোবর কম্পিউটার সায়েন্সের ১৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী এহতেশামুল আজিমকে ‘শিবির’ আখ্যায়িত করে শেরেবাংলা হল থেকে বের করে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁর মোবাইল ও ডেস্কটপ কম্পিউটার ছিনিয়ে নেওয়া হয়। কী কারণে ওই শিক্ষার্থীকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, তা সাধারণ শিক্ষার্থীরা এখনো জানেন না। জানার সাহসও দেখাননি। আবরার হত্যার পর এই মামলার আসামি শামীম বিল্লাহর কক্ষে দাঈয়ানের কম্পিউটার পাওয়া যায়।

সত্য বলতে ভয় পান
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বুয়েটে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলকভাবে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। যেমন আসতে-যেতে সামনে যাকে দেখবেন, তাঁকেই সালাম দিতে হয়, হোক তিনি জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী অথবা পিয়ন-আরদালি। এ ছাড়া ক্যাফে ও বাউন্ডারি দেয়ালে আয়েশি ভঙ্গিতে বসা যাবে না। বড়দের সামনে চেয়ারে বসা যাবে না। মিছিলে যেতে হবে। এসবের ব্যত্যয় ঘটলে ‘বড় ভাইদের’ হাতে শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়। শিক্ষার্থীরা জানান, প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে জ্যেষ্ঠদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটা এমন, ‘তোদের মার খেতে হবে, এরপর তোরা বড় হয়ে ছোটদের মারবি। না মারলে ছোটদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবি না।’

সব হলেই যেকোনো ধরনের অনিয়মের বিষয়ে প্রভোস্টের কাছে বেনামে অভিযোগ করার সুযোগ আছে। কিন্তু কেউ একজন অভিযোগ করলে সবার ওপর নির্যাতনের খড়্গ নেমে আসে। যে কারণে কেউই অভিযোগ করেন না। কয়েক মাস আগে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে জ্যেষ্ঠ ছাত্ররা প্রথম বর্ষের বেশ কয়েকজন ছাত্রকে সম্মেলন কক্ষে ডেকে নিয়ে শাস্তি দিচ্ছিলেন। এমন সময় প্রভোস্ট সেখানে হাজির হন। তিনি ছোটদের কাছে জানতে চান, তোমাদের শাস্তি দিচ্ছে নাকি? জবাবে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘না স্যার। আমরা রক্তদান কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছি।’ শিক্ষার্থীরা জানান, সব হলেই র‍্যাগিং প্রতিরোধে কমিটি আছে। তবে সেসব কমিটিতে নির্যাতনকারীদের সংখ্যাই বেশি।

প্রভোস্টরা নিয়মিত আসেন না
শিক্ষার্থীরা জানান, প্রথম বর্ষের ছাত্রদের ভর্তির পর প্রথম কয়েক দিন প্রভোস্ট ও ছাত্রকল্যাণ পরিচালক হলে আসা-যাওয়া করেন। পরে আর তেমন খোঁজখবর নেন না। এরপর দৃশ্যপটে আসেন নেতারা।
কাগজে-কলমে হলের সিট বরাদ্দ দেন প্রভোস্ট। প্রভোস্ট প্রথম বর্ষের কোনো শিক্ষার্থীর জন্য সিট বরাদ্দ দিলেও নেতাদের নির্দেশ ছাড়া এবং তাঁদের বশ্যতা স্বীকার না করা পর্যন্ত সেই সিট পাওয়া যায় না। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা সাধারণত পঞ্চমতলায় সিট পেয়ে থাকেন। শিক্ষাবর্ষ শেষে তাঁরা ধাপে ধাপে নিচে নেমে আসেন। কিন্তু নেতাদের সম্মতি ছাড়া কোনো শিক্ষার্থীর পক্ষেই পঞ্চমতলা থেকে চতুর্থতলায় নামা সম্ভব হয় না।

শিক্ষার্থীদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি হলে কম-বেশি ১০০ শিক্ষার্থী থাকেন। তাঁদের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ জন ক্ষমতার চর্চা করে থাকেন। বর্তমানে হলগুলোতে ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য কোনো সংগঠনের তৎপরতা নেই বললেই চলে। প্রতিটি হলেই ছাত্রলীগের একটি করে ‘অফিস’ আছে। হলের লাইব্রেরি দখল করে এসব অফিস করা হয়েছে। যে কারণে কার্যত হলের লাইব্রেরিগুলোতে যেতে পারেন না সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া শেরেবাংলা হল-সংলগ্ন একটি জায়গা আছে, যার নাম ‘লীগ কর্নার’। সেখানে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী ছাড়া অন্য কারও বসার সুযোগ নেই।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে শেরেবাংলা হলের সদ্য পদত্যাগী প্রভোস্ট জাফর ইকবাল খানের মোবাইল নম্বরে ফোন করে তাঁকে পাওয়া যায়নি।

শিক্ষার্থীরাই জানালেন, মেস ম্যানেজার হলের ক্যানটিন পরিচালনা করেন। ক্ষমতাধরেরাই এই দায়িত্বটি পেয়ে থাকেন। দায়িত্ব পাওয়ার অর্থ হলো, মেস ম্যানেজার ক্যানটিনের টাকা তছরুপ করে নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করবেন। এ নিয়ে কারও আপত্তি করার জো নেই। করলেই চড়-থাপ্পড় খেতে হবে। ক্যানটিন পরিচালনার এই দায়িত্বটি প্রতি মাসে পরিবর্তন হয়। বাকি নেতাদের আর্থিক সুবিধা দিতে এই নিয়ম চালু আছে।

পাঠকের মন্তব্য

লাইভ

টপ