নওগাঁয় ‘আব্দুল জলিল হেমো ডায়ালাইসিস সেন্টার’-একটি অনন্য সেবার পরশ

মো: ইদ্রিস আলী ০৩:২৮, ১৫ মার্চ ২০১৯

২০১২ সালের আগস্টে নওগাঁর কৃতি সন্তান, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারন সম্পাদক, সাবেক মন্ত্রী মরহুম জননেতা আব্দুল জলিলকে নওগাঁ জেলার সার্বজনীন উন্নয়নের রুপকার বলা হয়। তিনি তার জীবনদশায় নওগার আনাচে কানাচে সর্বত্র উন্নয়নের ছোয়ার পরশ বুলিয়ে দিয়েছিলেন। জেলাবাসীসহ আশপাশের স্বাস্থ্যসেবার জন্য বিশেষ করে কিডনি ডায়ালাইসিসের জন্য নওগা সদর হাসপালের একাংশে তৈরী করেন ‘আব্দুল জলিল হেমো ডায়ালাইসিস সেন্টার’ । মার্কেন্টাইল ব্যাংক ফাউন্ডেশনের সৌজন্যে ২ শয্যাবিশিষ্ট সেন্টারটি চালু করেন তিনি।  ২০১৩ সালে নতুন ৩টি মেশিন বাড়িয়ে মোট ৫টি মেশিন দিয়ে অদ্যাবধি ডায়ালাইসিস সেবা প্রদান করা হচ্ছে।

নওগাঁ সদর হাসপাল সুত্রে জানায়ায়, সেন্টারটি চালুর পর থেকে চলতিবছর গতমাস পর্যন্ত ৮৪২১ জন রোগী সেবা নিয়েছেন।  প্রথমে ২৯০০ টাকা খরচ হয় একজন রোগীর ডায়ালাইসিসের জন্য । এরপর ৪টি ধাপের প্রত্যেকটিতে ১৯০০ টাকা করে খরচ হয়। চতুর্থ ধাপের পর পুনরায় নতুন করে ২৯০০ টাকা দিয়ে ডায়ালাইসিস শুরু করতে হয়।

সেবাগ্রহনকারী বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহারের সূচরিতা দেবনাথ জানান, মাস্টার্সে পড়াশোনা করার সময় কোমরে ব্যথা অনুভব করেন। নানান চিকিৎসার একপর্যায়ে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে গিয়ে ধরা পড়ে কিনডির সমস্যা। ৩২ দিন ভারতে চিকিৎসা শেষে ফিরে আসেন দেশে। খরচ হয় প্রায় ৭ লাখ টাকা। বাবা মুদি দোকানি। ৩ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছোট। নিয়মিত ঢাকা অথবা অন্যত্র গিয়ে ডায়ালাসিস করা কষ্টসাধ্য ছিল। কিন্তু নওগাঁ থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে বাড়ি হওয়ায় কিছুটা সুবিধা পাচ্ছি। বাড়ি থেকে একা এসে চিকিৎসা নিয়ে আবার ফিরে যেতে পারছি। মঙ্গলবার নওগাঁ সদর হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেন্টারে সূচরিতা দেবনাথ চিকিৎসা নেয়া শুরু করেছেন তিনি। নওগাঁ সদর হাসপাতাল কাছে হওয়ায় একদিকে যেমন যাতায়াতে ভোগান্তির হাত থেকে রক্ষা, অন্যদিকে ভালো চিকিৎসা সেবাও পাওয়া যাচ্ছে।

নওগাঁ শহরের কোমাইগাড়ী মহল্লার বাসিন্দা গৃহবধূ সোহানী কাদের সানজু বলেন, গত সাড়ে তিন বছর থেকে সদর হাসপাতালে সপ্তাহে দুইবার চিকিৎসা নিচ্ছেন। বাড়ির পাশে যেমন ভালো সেবা পাচ্ছেন, অপরদিকে ভোগান্তির হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেন। শহরের হাট-নওগাঁ মহল্লার বাসিন্দা গোলাম রাব্বানী বলেন, গত তিনমাস আগে চিকিৎসার জন্য চেন্নাই যাওয়ার পর সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কিনডিতে রোগ ধরা পড়ে। বাড়ি থেকে বার বার বলা হচ্ছিল ডায়ালাইসিস নিতে হবে। আমি নিতে চাইছিলাম না। শেষে এই সেন্টারে নিয়মিত ডায়ালাইসিস সেবা নিচ্ছি।

ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত এক শিফটে পাঁচটি মেশিনের সাহায্যে সেবা দেয়া হচ্ছে। তবে মেশিনের সংখ্যা কম হওয়ায় ডায়ালাইসিস সেন্টারে তালিকাভুক্ত রোগীদের সিরিয়াল অনুসারে ডেকে সেবা দেয়া হয়। এখানে কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ছাড়াই হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তার এবং সেবিকারা চিকিৎসা দিচ্ছেন।

ডায়ালাইসিস সেন্টারে দেখভালকারী হায়াত মাহুমদ বলেন, আমরা এক শিফটে ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত পাঁচটি মেশিনে দুইজন সেবিকা দিয়ে সেবা দিয়ে থাকি। সেবার মান ভালো হওয়ায় অন্য জেলা থেকেও রোগীরা আসেন। দিন দিন এ রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। মেশিনের সংখ্যা কম হওয়ায় তালিকাভুক্ত রোগীদের সিরিয়াল অনুসারে ডেকে সেবা দেয়া হয়।

নওগাঁ আধুনিক সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মুনির আলী আকন্দ বলেন, এ জেলা ছাড়াও বাইরের জেলা থেকে কিডনি রোগীরা সেবা নিয়ে থাকেন। যে পরিমাণ রোগী আছে তার তুলনায় মেশিনের সংখ্যা কম। ডায়ালাইসিস সেন্টারে কোনো কিডনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের দিয়ে রোগীদের সেবা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া ‘হেপাটাইটিস বি পজেটিভ’ মেশিন জরুরি প্রয়োজন। এ মেশিন থাকলে রোগীদের সেবার মান আরও বৃদ্ধি পাবে।

গত ৮ বছরে হাসপাতালে কিডনি রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও বাড়েনি যন্ত্রপাতি। সেবার মান ভালো হওয়ায় অন্য জেলা থেকেও এ হাসপাতালে আসছেন কিডনি রোগীরা। ‘হেপাটাইটিস বি পজেটিভ মেশিন’ না থাকায় রোগীদের অন্যত্র চলে যেতে হচ্ছে। জেলার ১১টি উপজেলা ছাড়াও বগুড়া, জয়পুরহাট জেলা থেকেও কিডনি রোগীরা সেবা নিয়ে থাকেন। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে রোগীর চাপ, অপরদিকে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও জনবল না থাকায় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা।

কিডনির রোগীদের সু-চিকৎসা নিশ্চিতকরনের লক্ষ্যে,  হাসপাতালে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও জনবল দেয়ার দাবি রোগী ও স্বজনদের। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেছেন সেবাগ্রহনকারীগন।

পাঠকের মন্তব্য

লাইভ

টপ