সর্বশেষ :

নিহত সন্তানের বদলে আয়া-বুয়ার চাকুরীর প্রলোভন

নিজস্ব প্রতিবেদক ০২:০৫, ২৭ নভেম্বর ২০১৯

তোরা গরীব এই মামলা চালাবি ক্যামনে? এখন মিল্কভিটা কোম্পানি মানবতার খাতিরে তোকে আয়ার চাকুরি দিচ্ছে পরে হয়তো তাও দিবেনা। তখন কি করবি ? তোরা এ মামলা চালিয়ে কি করবি?” গত ১৭ নভেম্বর রাজধানীর মিরপুর কমার্স কলেজের সামনে মিল্কভিটার একটি কাভার্ডভ্যানের বেপোরয়া চালানোর ফলে ওই গাড়ী চাপায় নিহত হয় শিশু মোঃ হাফেজ। অসহায় মা পাখি আক্তারকে আয়া বুয়ার চাকুরীর বিনিময়ে মামলা আপোষ করতে প্রলুব্ধ করেন মিল্কভিটার লোকজনসহ খোদ শাহ্আলী থানার কয়েকজন পুলিশ’ বলে অভিযোগ করেন নিহত শিশুর পিতা মাতা।

মিল্কভিটার কাভার্ডভ্যান (নং-ঢাকা মেট্রো উ-১১-০০৫৪) চাপায় নিহত শিশু হাফেজের মা পাখি আক্তার কান্নারত অবস্থায় আরো অভিযোগ করেন, ১৯ নভেম্বর থানার অফিসাররা আমাকে ফোনের উপর ফোন দিয়ে অস্থির করে তোলে। খুবই জরুরী এখনই দেখা করতে হবে জানিয়ে আমাদের (নিহত শিশু হাফেজের পিতা/মাতা) থানায় নিয়ে গিয়ে ওসি তদন্ত মেহেদী স্যারসহ আরো সব বড় স্যাররা একটি দরখাস্তে সই করতে বলে। আমি দিতে রাজি না হওয়ায় তারা জানায় এটি মামলার প্রয়োজনে দিতে হবে। আমি তখন সই দেই। পরে আমি আশপাশের কয়েকজনকে জানালে তারা আমাকে জানায়, এটি একটি চাকরীর দরখাস্ত। যেখানে লেখা আছে তোমার ছেলে রাস্তা পার হইতে গিয়ে গাড়ী চাপায় মারা গেছে, আর তুমি এর বদলে মিল্কভিটা অফিসে কাজের আয়া অথবা মালি যেকোন একটা চাকুরীর আবেদন করেছো। তোমাদের এই মামলার আপোষ-মিমাংশা প্রায় শেষের দিকে। এ কথা জানার পর আমরা ওসির সাথে মূল বিষয়টি জানার জন্য গেলে থানার লোকজন আমাদের সাথে খুবই খারাপ ব্যবহার করে। মনে হচ্ছে আমরা আমাদের সন্তান হারানো বিচার চাওয়ায় অপরাধ করে ফেলেছি।

নিহত শিশু মোঃ হাফেজের মা কাঁদতে কাঁদতে আরো অভিযোগ করে জানান, ওরা দরখাস্তে লিখেছে আমার ছেলে রাস্তা পারাপার হওয়ার সময় মিল্কভিটার গাড়ী চাপায় পড়ছে কিন্তু এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমার ছেলে রাস্তার একপাশে আমার এক হাত ধরে দাড়িয়ে ছিল। আমার হাত থেকে আমার ছেলেকে হঠাৎ করে কে যেন ছিনিয়ে নিয়েছে। সকাল বেলা আমার চোখের সামনে আমার ছেলেকে ওই গাড়ী পিসাইয়া মারছে।

মিল্কভিটা কোম্পানি আর পুলিশ সব জানে কিন্তু সেই শাহিন ড্রাইভারকে না ধরে উল্টা আমাকে আয়া-বুয়ার চাকুরীর লোভ দেখিয়ে আপোষ করতে বলছে। শুনেছি ড্রাইভার শাহিন আলমকে নাকি ঢাকা থেকে সরিয়ে দিয়ে পাবনায় মিল্কভিটার আরেক শাখায় লুকিয়ে রেখেছে।

মিল্কভিটার কভার্ডভ্যান চাপায় নিহত শিশু হাফেজের মা আর্তনাত করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীও একজন মা। তারও সন্তান আছে। আপনাদেরও সন্তান আছে। আপনাদের চোখের সামনে যদি আপনার হাত ধরে থাকা সন্তানকে এরকম কোন ড্রাইভার তার গাড়ী দিয়ে পিসিয়ে মারে আপনাদের কেমন লাগবে ? আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ হত্যার বিচার চাই।

যারা আমাকে মিল্কভিটায় অস্থায়ী একটি আয়ার চাকুরি দেয়ার লোভ দেখিয়ে মামলা আপোষ করার প্রলোভন দিচ্ছে তাদের বিচার চাই। আমি গরীব তাহলে কি আমার মামলা চলবে না? তাহলে মিল্কভিটা ওয়ালাদের বড় স্যাররা আছে থানার অফিসারদের ক্ষমতা আছে আর তাদের টাকা আছে বলেই কি আমার ছেলেকে এই ড্রাইভার এভাবে মেরে ফেলবে? তার কোন বিচার পাবো না? আমি আয়া বুয়ার চাকুরী চাই না, আমি এর বিচার চাই।

এবিষয়ে শাহ্আলী থানার ওসি সালাউদ্দিন জানান,  এ বিষয়ে একটি মামলা হয়েছে এবং আসামী বর্তমানে পলাতক। আমরা আসামীকে আটকের চেষ্টা করছি।

উল্লেখ্য, রোববার সকাল সোয়া ১০টার দিকে মিরপুরের কমার্স কলেজের পাশে ঝিলপাড় বস্তির সামনের সড়কে মিল্কভিটার একটি কাভার্ডভ্যান (নং-ঢাকা মেট্রো উ-১১-০০৫৪) শিশু হাফেজকে লক্ষ করে চাপা দিলে তার মাথা চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে মস্তক বেরিয়ে রাস্তার সাথে মিসে গেলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে এলাকাবাসী গাড়িটিকে ধাওয়া করলে চালক শাহিন আলম (২৬) গাড়ি ফেলে পালিয়ে যান।

এ বিষয়ে শাহ আলী থানায় ২৭৯/৩০৪-খ পেনাল কোড-১৮৬০ অনুযায়ী দ্রুত ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ী চালাইয়া মৃত্যু ঘটানোর অপরাধে। নিহতে বাবা হানিফ বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। যাহার নং-১৪/৩৫০, তাং-১৭/১১/২০১৯।

এ ঘটনায় প্রায় ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন স্থানীয় লোকজন ও পথচারী। বিক্ষোভ চলাকালিন সময়ে শাহআলী থানার পুলিশ এসে গাড়ীসহ নিহত শিশুকে তাদের হেফাজতে নেন। গাড়ী থানায় নিতে গেলে পুলিশ বিপাকে পড়ে। পরে বিক্ষোভকারীদের বুঝিয়ে আইনের মাধ্যমে অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার আস্বাস দেন।

নিহত শিশুটির নাম মো. হাফেজ । তার বাবা হানিফ মিয়া এবং মা পাখি আক্তার । তারা শাহ আলী থানাধীন ঝিলপাড় বস্তিতেই থাকেন এবং শিশুটির মা পাখি আক্তার সড়কের পাশে পিঠা বিক্রি করেন। বাবা হানিফ মিয়া পেশাগত কারণে চট্টগ্রামে থাকেন। তাদের দেশের বাড়ি ভোলা জেলায়।

পাঠকের মন্তব্য

লাইভ

টপ