সর্বশেষ :

পরিবারই হোক টিনএজ’দের প্রধান পাঠশালা

মোঃ মামুনুর রশিদ ১২:৪৩, ২ আগস্ট ২০১৯

তেরো থেকে উনিশ, জীবনের এই সংক্ষিপ্ত সাত বছর সময়টাকে ইংরেজীতে টিনএজ বলা হয়। সময়টা খুব সংক্ষিপ্ত হলেও একজন মানুষের পুরো জীবনের উপর এতোটাই প্রভাব ফেলে যে, সে কথা লিখে বা বলে শেষ করা সম্ভব নয়। অতীত থেকে আজকের পৃথিবীতে যতো প্রকার অপরাধ সংঘটিত হয়েছে অপরাধীদের জীবনের পিছনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে টিনএজ থেকেই তার সূত্রপাত। মাত্র এই সাতটি বছর এমন যে, কোন ছেলে বা মেয়ে এই সময়টাতে পজেটিভ চিন্তা চেতনা নিয়ে গড়ে ওঠে তাহলে সে একজন আদর্শবান মানুষ হবে । অন্যদিকে আবার কোনো ছেলে বা মেয়ে যদি নেগেটিভ চিন্তা চেতনা নিয়ে গড়ে ওঠে তাহলে সে নিশ্চিত খারাপ পথে ধাবিত হবে। টিনএজ এমন একটা সময় এ সময়টাতে যে যেমনটা প্রাকটিস (চর্চা) করবে সে তেমন ভাবেই গড়ে উঠবে।

তাই একটি সন্তানকে আদর্শবান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে এর জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন পারিবারিক শিক্ষা। এছাড়া টিনএজদের ভিতর পজেটিভ চিন্তাগুলো স্থায়ী করণের লক্ষ্যে পরিবারের পাশাপাশি সমাজ,রাষ্ট্র সবারই ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। এর জন্য সঠিক শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি ঘটাতে হবে । কারন একজন দক্ষ কৃষক তিনি জানেন- কোন ফসলের বীজ কখন বপন করতে হয়। অধিক ফসল উৎপাদনের জন্য সঠিক সময়ে বীজ বপনের তুলনা নেই। নিজের অবহেলায় কোনো কৃষক যদি সঠিক সময়ে বীজ বপন করতে না পারেন, তিনি কখনও ভালো ফসল সংগ্রহের আশা করতে পারবেন না।

ঠিক তেমনি একজন অভিভাবক ও শিক্ষককে জানা দরকার কোন বয়সী ছেলে মেয়েদের কোন ধরনের শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। যদি অসচেনতা বা অবহেলার কারনে একজন অভিভাবক তার সন্তানকে সঠিক শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হয় তাহলে তিনি কোনো দিনই আশা করতে পারবেন না তার সন্তান বড় হয়ে আদর্শবান হবে। উপরšুÍ উল্টোটা হয়। প্রেম ভালোবাসা নামে ভন্ডামি করে। ব্যর্থ হলে খাতিজার মতো মেয়েদের হত্যার অপচেষ্টা চালায়, বিশ্বজিৎ কে হত্যা করে, নুশরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে মারে, সাবেক প্রেমিকার সামনেই তার স্বামীকে কুপিয়ে মারে, নেশা করে, ছিনতাই করে, বড় বড় অফিসে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হয়। পারিবারিক অসচেতনতা আর সুশিক্ষায় এর জন্য দায়ী।
আমাদের দেশে টিনএজদের সার্বিক উন্নতির জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করে তা অনেকটা এক পেশে। ধর্ম প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করে প্রধানত বিধি নিষেধ নিয়ে। কেন, আদেশ-নিষেধ পালন করতে হবে তা প্রায় এড়িয়ে যায়। যেমন সকল ধর্মে বলা হয়েছে পর নারীর প্রতি কু-দৃষ্টিতে তাকানো যাবে না। কিন্তু কেন মানুষ কু-দৃষ্টিতে তাকায়? এর জৈবিক ভিত্তি কী ? তাকালে শারীরিক ও মানসিক কী ক্ষতি হয়? সেসব বিষয়ও এড়িয়ে চলি আমরা। এ বয়স থেকেই শরীর ও মন আরো কী কী চায়? সেসব আলোচনা করতে গেলে আমরা অনেকটা লজ্জাবোধ ও নিষেধ মনে করে থাকি। অথচ উপরিউক্ত প্রশ্নের উত্তর সকল ধর্মেই সীমাবদ্ধতার মধ্যে খুলে বলা হয়েছে। ধর্ম চর্চার মাধ্যমে সন্তানকে সেসব শিক্ষা দিতে পারলে অনেকটা সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আর এদিকে সাধারন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্য আর যাই হোক কর্মে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, টাকা কামাই-ই তাদের প্রধান লক্ষ্য।

ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষাকে অনেকটা জিইয়ে রাখার মতো। তাই তো দেখা যায় ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার বিষয়টি সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শেষ পিরিয়ডে পড়ানো হয়। শেষ সময়ে শিক্ষার্থীরা যখন পাঠে অমনোযোগী তখন এই গুরুত্বপূর্ণ্য বিষয়টি পড়ানো হয়। আবার দেখা যায় ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা না পেয়ে অনেকে জঙ্গিবাদ ভূঙ্গিবাদে জড়িয়ে পরে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষে বড় হয়ে তারা ঠিকই টাকা কামাই করে, সাথে সাথে দুর্নীতিতে ও জড়িয়ে পরে।
তবে আর যাই হোক আমাদের দেশে প্রতিটি পিতা-মাতা চায় তার সন্তানরা বড় হয়ে নম্র,ভদ্র ও আদর্শবান হবে। সৎ উপায়ে উপার্জন করে জীবন যাপন করবে। কেনো রকম মাদক গ্রহন করবেনা অথবা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত হবেনা। প্রতিটি পিতা-মাতা শুধু সন্তানের কাছে এমনটাই আশা করে। অথচ কিছু পেতে হলে যে একটু শ্রম দিতে হয় -সে সম্পর্কে অনেক পিতা-মাতা উদাসীন। একজন অভিভাবকই পারে তার সন্তানকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। আর এজন্য টিনএজ বয়সে দিতে হবে সুশিক্ষা।

আপনি আপনার টিনএজ বয়সী সন্তানকে ঘুম থেকে তুলে একসাথে নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে নিয়ে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। তাতে নিজ ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে সে কখনো অন্যের ধর্মের প্রতি অসহিঞ্চু মনোভাব নিয়ে গড়ে উঠবেনা। ধর্মের মূলবাণী আপনার টিনএজ সন্তানের ওপর স্থায়ী করতে না পারলে জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এসে যেকোনো অপরাধের সাথে জড়িয়ে পরতে পারে। আপনি যদি মুসলিম হোন, আপনার টিনএজ সন্তানকে শিক্ষা দিলেন আমাদের প্রধান ধর্মগুরু মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) ছিলেন নিজ ধর্মের প্রতি যেমন অটুট তেমনি অন্য ধর্মের প্রতিও সহিঞ্চু মনোভবে দৃঢ়। আপনার এই সন্তান বড় হয়ে কখনোই মন্দিরে বা গীর্জায় বোমা মারতে পারবেনা।

আপনি যদি অন্য ধর্মালম্বী হোন তাহলে আপনিও ঠিক অনুরুপ শিক্ষা দিলেন। তাহলে আপনার সন্তানও কখনোই ইসলাম ধর্মকে উগ্রবাদী, চরমপ্রন্থী ধর্ম বলবেনা। মসজীদে কখনোই বন্দুক হামলা করবেনা। ধর্ম শিক্ষার পাশাপাশি সাহিত্য নির্ভর শিক্ষাটাও দেয়া প্রয়োজন। সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ বলেছেন, “যে পিতা রাতে সন্তান নিয়ে এক সাথে খাবার খাবে সে কখনই অবাধ্য হবে না”। টিনএজ সন্তানের সাথে পিতা-মাতার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে কৌশলে পজেটিভ চিন্তাগুলো মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া উচিৎ। তবে পরিশেষে বলি; পারিবারিক বলেন আর প্রাতিষ্ঠানিকই বলেন সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো ধৈর্য্যের শিক্ষা। পিতা-মাতা তার সন্তানকে আদর্শবান রুপে দেখতে চাইলে সবগুলো শিক্ষাই দিতে হবে কৌশলে ও ধীরগতিতে।

লেখকঃ-শিক্ষক ও কলামিস্ট

পাঠকের মন্তব্য

লাইভ

টপ