সর্বশেষ :

পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরু তিস্তায় গিলছে, এমনকি কবর দেয়ার জায়গাও নাই বাহে

নুরনবী সরকার, লালমনিরহাট ০৬:৫৯, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

এক একর আবাদি জমি, পুকুর ভরা মাছ আর গোয়াল ভরা গরু ছিল। সবগুলা তিস্তা  নদী গিলে খাইছে। ৫ বার বাড়ি ভাঙ্গতে হয়েছে। এখন মরলে কবর দেয়ার মত জায়গা নাই বাহে। বাঁধ দেয়ার লোভ দেখিয়ে ভোট নেয়। এমপি মন্ত্রী হইলে আর দেখা পাওয়া যায় না। হামার দুঃখ কায়ো দেখে না বাহে।
শুক্রবার (২০ সেপ্টেম্বর) সকালে এভাবে কথাগুলো বলেন তিস্তা নদীর কড়াল গ্রাসে বিদ্ধস্থ  লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের সিংগিমারী গ্রামের বয়োবৃদ্ধ মাহবুবার রহমান (৮৫)।
ওই বৃদ্ধ মাহবুবার রহমান জানান, বৃহস্পতিবার রাতে তিস্তা নদীর বাম তীরে তাদের সিংগিমারী গ্রামে ১০টি পরিবার ভাঙনের কবলে পড়ে। গ্রামটির বাসিন্দা মানিক, তোফাজ্জল, মোকলেছার, মন্টু, মোজাহার, মতিন, রফিকুল, দুলাল, মকবুল ও আব্দুল জলিলকে রাতের মধ্যে ঘর বাড়ি সড়াতে হয়েছে। কেউ অন্যের ডোবা জমিতে বা বাঁশ বাগানে ঘর আপাত রেখেছেন। কেউ জায়গা না পেয়ে ঘর খুলে রাস্তার পাশে স্তুপাকারে রেখে খুঁজছেন মাথা গুজার ঠাঁই।
একবার বা দুই বার নয়। কেউ কেউ ১৫/২০ বার পর্যন্ত তিস্তার কড়াল গ্রাসে বাড়িঘর সড়িয়ে নিয়েছেন। দ্বিতীয় বার থেকে ঠাঁই হয়েছে অন্যের পরিত্যাক্ত জমিতে। তবুও মাত্র একটি ঘর বা টিনের ছায়লায় মানবেতর জীবন যাপন। কেউ কেউ জমি বন্দক নিয়ে ঘর বাড়ি গড়ে তুলেন। বছর অতিবাহিত না হতেই আবার ভাঙনের কবলে পড়তে হয়। তাই ত্রাণ নয়, তিস্তা নদী খনন করে স্থায়ী বাঁধ দিতে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
জানা গেছে, গত সোমবার রাত থেকে হঠাৎ বাড়তে থাকে তিস্তা নদীর  পানি প্রবাহ। যা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়ে পরদিন  মঙ্গলবার রাত ১ টায় দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজে তিস্তা নদীর পানি প্রবাহ বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বন্যায় প্লাবিত হয় নদী তীরবর্তি অঞ্চল। এর একদিন পর বুধবার পানি প্রবাহ কমে গিয়ে বৃহস্পতিবার লালমনিরহাটে বন্যা পরিস্তিতির পুরোপুরি উন্নতি ঘটে। স্বল্প সময়ের এ বন্যায় তিস্তাপাড়ের কৃষকদের আমন ধান ক্ষেত ডুবে যায়। পানিবন্দি হয়ে পড়েছিল জেলার ৫টি উপজেলার ৫/৭ হাজার পরিবার।
বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্থ ঘর বাড়ি মেরামত করতে না করতেই ভাঙনের কবলে পড়েছে তিস্তার বাম তীরের মানুষ। বন্যার পানি কমলেই তিস্তার তীরে ভাঙন শুরু হওয়া তিস্তা নদীর একটা চিরাচরিত রুপ বলে দাবি করেন তিস্তাপাড়ের মানুষ।
সিংগিমারী গ্রামের রফিকুল ইসলাম বলেন, ভাঙনের কবলে পড়ে গত এক মাসে ৩ বার বাড়ি সড়াতে হয়েছে। জীবনে ১৮/২০ বার তিস্তার ভাঙনে বসতভিটা হারিয়েছি। বন্যা আর ভাঙনের সময় রাত জেগে পাহারা থাকতে হয়। ঘর বাড়ি ভেসে যাওয়ার আতংকে কাটে রাত। ত্রাণ চাই না, স্থায়ী বাঁধ চাই। যাতে ডাল ভাত খেয়ে নিঃশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারি।
তিস্তা পাড়ের দক্ষিণ বালাপাড়ি গ্রামের আঃ রহিম জানান, এ বন্যা স্থায়ী না হলেও স্রোতে গতি ছিল খুব বেশি। অনেক জায়গায় রাস্তা ঘাট নষ্ট হয়েছে। বাড়ি ঘরের অনেক জিনিসপত্র পানিতে ভেসে গেছে। ছেলে মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর মত রাস্তাও নেই। চারদিকে পানি তাদেরকে স্কুলে পাঠানোও অনিরাপদ। পেটের দায়ে শ্রম বিক্রি না করে সন্তানদের স্কুলে রাখতে গেলে না খেয়ে মরতে হবে। গেল ভোটের সময় মন্ত্রী বললেন উজানে তিস্তার বাঁধ নির্মান শুরু হয়েছে। ভোট দিলে বাকী কাজ শেষ হবে। ভোট নিয়া এখন আর বাঁধের কোন খবর নাই।
সদর উপজেলার কালমাটি বাগডোরা গ্রামের বাসিন্দা তোফাজ্জল বলেন, কতবার আর বাড়ি সড়াই? কেউ তো বাড়ি করার মত জমি দিতে চায় না। জীবনে ৮ বার বাড়ি ঘর বিলিন হয়েছে। রাস্তার ধারে করা টিনের ছালার পাশেই বয়ে চলছে হিংস্রো তিস্তা নদী। যেকোন মুহুর্তে ভেসে যাবে ঘর বাড়ি। কিন্তু জায়গার অভাবে সড়তে পারছি না। তিনিও  তিস্তা নদীর স্থায়ী বাঁধের দাবি জানান।
জেলা ত্রাণ ও পুনবাসন কর্মকর্তা আলী হায়দার বলেন, ইতিপুর্বে ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোকে পরিবার প্রতি দুই বান ঢেউটিন ও ৬ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। গেল বন্যার পর নতুন করে ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর তালিকা করতে বলা হয়েছে। তালিকা পেলে তাদেরকেও পুনবাসন করতে টিন ও নগদ টাকা বরাদ্ধ দেয়া হবে।

পাঠকের মন্তব্য

লাইভ

টপ