সর্বশেষ :

ভয় পায় আতঙ্কিত হই

নিপুল কুমার বিশ্বাস ০১:০৫, ২৩ জুন ২০১৯

ভয় হলো মনের অবচেতন স্তরের একটি বিশেষ মানসিক অবস্থা । সবার ভিতরে এর একটা নিদিষ্টতা আছে কিন্তু যখন এটা মাত্রাতিরিক্ত হয়ে দেখা দেয় তখন ভীতিরোগ বা ফোবিয়া হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কোন অদৃশ্য বা দৃশ্যমান বস্তু দ্বারা সৃষ্ট মনের অজানা আশংকায় ভয়, যেটা মনোজগতের সমস্যা। ভয় বা ভীতির নানা প্রকার উপসর্গ দেখা যায় শব্দ ভীতি , উচ্চতা ভীতি, মাকড়শার ভয় ,তেলাপোকার ভয়, বিদ্যুৎ চমকানো বা বাজ পড়ার ভয়, রাস্তা পারাপারের ভয়, একাকীত্বের ভয়, উড়ার ভয়,পরীক্ষার ভয়, ষাড়ের ভয়, ষড়যন্ত্রের ভয়, সুচ বা ইনজেকশনের ভয়, রাজনীতির ভয়, রাজনীতিবিদ দ্বারা সৃষ্ট ভয়, গাছ পালা বা জঙ্গলের ভয়, প্রেমিক প্রেমিকা হারানোর ভয়, সর্বপরি ভুতের ভয়।
মধ্যযুগীয় বাংলার চতুর্থ রাজা ছিলেন বল্লাল সেনের পুত্র লক্ষণ সেন , রাজ পরিবারের রক্ত লক্ষণ সেনের শরীরে নিজেও রাজা, রাজত্ব ছিল কামরুপ (বর্তমানে অসম), কলিঙ্গ ( বর্তমানে ওড়িশা) ও কাশী পর্যন্ত বিস্তৃতি ছিল। ১১৭৮-১২০৬ শাসন করার পরও শুধুমাত্র ভয়ের কারনে মাত্র ১৮ জন সৈন্য সহ ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজীর কাছে পরাজয় মেনে নিয়ে প্রাণ ভয়ে বঙ্গ দেশে পালিয়ে গেল। আবার ভয়ে গাছে, পাহাড়ে, গুহায় লুকিয়ে থেকে ভয়কে জয় করে সামনের দিকে অনেক মহারথী এগিয়ে গেছে, অনেক গডফাদার, জঙ্গি গোষ্টি বছরের পর বছর অন্তরালে প্রশাসন বা পুলিশের ভয়ে লুকিয়ে থেকে গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পৃথিবীর বুকে বড় বড় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে শুধুমাত্র ভয়কে জয় করে।
ছোট বেলাই বেশির ভাগ বাচ্চাদের ভিতর বিশেষ করে গ্রামে যে সকল ছেলে বা মেয়ে বড় হয়েছে , কোন নিদিষ্ট স্থান (শ্বাশান ঘাট), শড়া গাছ , প্রাচীন বট গাছ, গভীর বাঁশ বাগানের ভিতর দিয়ে গেলে ভয়ে গা ছম ছম করত আর যদি সাথে ভুতুম পেঁচা ডেকে উঠত তাহলে আর কথা নাই ভয়ে দম বন্ধ হয়ে জ্ঞান হারাবার উপক্রম হতো। তাল গাছের শড় শড় করে নেমে আসা ভূতের ভয়ের কথা নাই বা বললাম ,ভয়ে তালগাছ বেয়ে আদৌও ভূত নেমেছে কি না, পিছন ফিরে দেখার সাহস হয়নি কারো। নারায়নগঞ্জের সাত খুনের মামলার আসামী নুর হোসেন ভয়ে ভারতে পালিয়ে যায়, রসু খ্যাঁ, এরশাদ শিকদারের মতো লোকেরাও ভয় পায়।
এতো গেল অতীতের কথা , বর্তমানে সমাজ ব্যবস্থায় স্বাধীন রাষ্টে ভয় আমাদের সবাইকে প্রতি নিয়ত তাড়া করে নিয়ে বেড়াচ্ছে, যেমন ধরুন গভীর রাতে র‌্যাবের ফোর্স আপনার বাড়িতে বা আপনার কাছে উপস্থিত হলে বন্ধুক যুদ্ধ বা ক্রসফায়ারের আতংকে প্রাণ চলে যাওয়ার উপক্রম হবে। রাস্তা দিয়ে একটু বেশি রাতে চলাচল করছেন পুলিশ মামার সাক্ষাৎ হয়ে যেতে পারে, নানা প্রশ্ন, এতো রাতে কেন বাইরে? কথা সন্তোষজনক না হলে, হয়ে যেতে পারেন যে কোন ধরনের আসামী। আর যদি ছিন্তাই কারীর স্বাক্ষাৎ পান তাহলে সর্বস্ব হারাবেন, বেশি বাহাদুরি দেখানোর চেষ্টা যদি করেছেন তো হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ভয় রয়েছে।
মেধাবী ছেলেটা দিন রাত পড়াশুনা করছে, পরীক্ষার আগের রাতে প্রশ্নপত্র ফাঁস অভিভাবকের ভয় মেধাবী ছেলে আমার পড়াশুনা ছেড়ে পাশের মেস, কোচিং বা ফেসবুকে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র খুজছে কিনা? মোবাইল খুললে ম্যাসেজ অথবা পত্রিকা খুললে ছোট আকারে বিজ্ঞাপন পাবেন, সকল প্রকার সার্টিফিকেটের জন্য আমরা আছি, আরও অবাক হয় যখন দেখি মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নিয়ে সারাজীবন চাকুরী করে অবসরে যাওয়ার পর প্রমাণিত হয় মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে তিনি চাকুরি করে গেছেন আবার সম্মানীয় বড়কর্তা ব্যক্তিদের ডক্টরেট নামে ডিগ্রিটাও সন্দেহের তালিকায় পড়ে। ছেলে মেয়ে স্কুল কলেজ যাচ্ছে, রাস্তার বাস- ট্রাকের যে অসুস্থ্য প্রতিযোগিতা, অনিয়ন্ত্রিত ড্রাইভার-হেলপার, বাবা-মার ভয় সন্তান নিরাপদে সুস্থ্যভাবে বাসায় ফিরবে কিনা? ভয় পায় সমাজের পথ প্রর্দশক, সকল স্তরের মানুষের কাছে অত্যন্ত সম্মানীয় অধ্যক্ষ, স্কুলের শিক্ষক, ইমাম, পুরোহিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তাদের মধ্যেও কিছু দুষ্কৃতিকারীর বিকৃতি রুচির, কুলশিত মনের চরিত্র প্রকাশ পায়। চারিদিকে যেভাবে যৌন লালসার কামার্ত চরিত্র প্রকাশ পাচ্ছে, সমাজের নিরিহ মেয়েগুলি আতঙ্কিত ও ভয় পায় স্বাভাবিক ভাবে চলাফেরা করতে গিয়ে, যৌন হয়রানির মতো নিকৃষ্ট আচরনের শিকার হয়ে তনু, নুসরাত ও শাহিনুর আক্তারের মতো মৃত্যুবরণ করতে হয় কিনা।
ছাত্র জীবনে নীতি আর্দশের পড়া পড়তে পড়তে আর পরীক্ষার খাতায় সৎ ভাবে দক্ষভাবে সমাজ গড়ার বুলি আওড়িয়ে, ভয় পায় আতঙ্কিত হই পড়াশোনা শেষ করে ঘুষ দিয়ে আবার চাকুরি নিয়ে নীতি আদর্শ বিসর্জন দিতে হয় কিনা ? রোগী আতঙ্কিত, রোগে কাহিল হয়ে গেছে ডাক্তারের কাছে প্রেসক্রিপশন করতে যেতে ভয় পায়, কারন বর্তমানে প্রেসক্রিপশনের আকার সাথে ঔষধের তালিকাও বৃদ্ধি পেয়েছে, বোনাস হিসেবে প্রেসক্রিপশনের সাথে এক ডর্জন অপ্রয়োজনীয় টেষ্ট, সেটা আবার বাধ্য করা হয়েছে নির্ধারিত ডায়াগনষ্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা নীরিক্ষা করতে। ভয় পায় সামরিক খাতে বরাদ্দ দ্বিগুন হয় আর সাধারণ মানুষের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাখাতে নূন্যতম বরাদ্দ পায়। অবাক দৃষ্টিতে আতঙ্কিত মনে ভাবি বসে কৃষকের একমণ ধান উৎপাদন করতে উৎপাদন খরচ হয় সাতশত পঁয়ত্রিশ থেকে সাতশত সত্তোর টাকা আর সরকার ধানের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করেন ছয়শত পঞ্চাশ টাকা।
রোহিঙ্গাদের বিশ মাসে এক লক্ষ বিশ হাজার শিশু জন্মগ্রহণ করেছে, কক্সবাজার জেলায় বসবাসকারী বাংলাদেশীরা ভয় পায় আতঙ্কিত হয় এই রোহিঙ্গাদের জন্য একদিন তাদের নিদারুণ কষ্ঠের জীবন অতিবাহিত করতে হবে নয়তো নিজ জেলায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠির মতো জীবন যাপন করতে হবে । তিন পার্বত্য জেলার উপজাতি মানুষ গুলি ভয় পাই বাঙ্গালীদের কারনে তাদের জমি ও চাকুরীর কোটা হারিয়ে না যায়। হিন্দু সম্প্রদায় সারাক্ষণ ভয় পায় মেয়েটি অন্যধর্মের ছেলের সাথে প্রেম করে ধর্মান্তরিত হয়ে সংসার বাঁধল কিনা, আর্থিক লোভে হোক আর ধর্ম প্রচারক মার্কেটিং লোকের প্রচারনায় হোক কেউ আবার ধর্মান্তরিত হয়ে গেলো কিনা, অথবা জমি ভিটে বাড়ী দখল হয়ে গেলো কিনা। উপাসনালয়ে উপাসনা করতে যাব এখন শুরু হয়েছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কে লক্ষ্যে করে আক্রমনের যুদ্ধ কে কার যুদ্ধে বেশি প্রাণ হত্যা করতে পারে , অবস্থা দৃষ্টিতে মনে হয় এই ঘৃর্ণিত হত্যায় পরকালের পরম তৃপ্তি বিরাজমান। বাবা-মা সন্তানকে বিয়ে দিতে ভয় পায়, বিয়ের পর ছেলে আবার পর হয়ে যায় কিনা ? ল্যান্ডওনার ভয় পায় ডেভেলপারকে জমির ব্যাপক ক্ষমতা সম্পন্ন দলিল করে দিয়ে পরে বিল্ডিং বুঝে পাবো কিনা ? মধ্যবৃত্ত পরিবারের লোকগুলি ভয় পায় ডেভেলপারকে জীবনের সমস্ত সঞ্চয় তাদের হাতে দিয়ে ফ্লাট বুঝে না পেয়ে পাগল হয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে হয় কিনা। ধনী মানুষ গুলি নিমন্ত্রণ খেতে ভয় পায়, তৈলাক্ত রাজশিক খাবার খেয়ে পরে আবার হার্ট এ্যার্টাক না হয় ? ফরমালিন বা কেমিক্যাল মেশানো ফল-মূল, মাছ- মাংস, ইনজেকশন দেওয়া তরমুজ, বাজারের পাকা বেলের অধিকাংশ সিদ্ধ অথবা তাপে ধোঁয়া দিয়ে হলুদ বর্ণ করে রাখা খেতে ভয় পায়। ভয় হয় টেংরা মাছ কিনতে গিয়ে গুলশা মাছ কিনে ফেললাম কিনা ? দেশী বলে চাষের টা দিলো কিনা? ভয় পেয়ে চমকিত হয় যখন বিজ্ঞাপনে দেওয়া হয় ডিটারজেন্ট পাউডারে ১০০% লেবুর শক্তি অথবা তাজা লেবুর সুগন্ধি ভরা, আতঙ্কিত হই পরীক্ষাগারে নেওয়ার পর লেমন জুস আর ম্যাংগ জুসে লেবু ও আমের কোন অস্তিত্ব নাই। ভেজালের মাত্রা এতোবৃদ্ধি পেয়েছে, ভয় পায় আতঙ্কিত হই বিষ খেয়ে মরতে গিয়ে ভেজাল বিষের কারনে আবার বেঁচে যেতে হয় কিনা ?
পুরস্কার নিতে ভয় পাই ক্রেষ্টে আবার সোনার পরিবর্তে তামা মেশানো হয় কিনা। বর্তমানের অসহিষ্ণু সমাজে সত্য কথা বলতে ভয় পায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে ভয় পায়, রুখে দাঁড়াতে ভয় পায়, কেউ ক্ষমতা ছাড়তে ভয় পায়, কেউ ক্ষমতা নিতে ভয় পায়, চোর মালিক কে ভয় পায়, মালিক চোরের ভয়ে থাকে , ডাকাতকে ডাকাত বলতে ভয় পায়, ঘুষ দিবো না বলতে ভয় পায়, কেউ নিরপেক্ষ নির্বাচনে ভয় পায়, আবার আগুনে আটকে পড়া মানুষ গুলি যখন ভয়ে আতঙ্কিত থাকে তখন অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা বুকে সাহস নিয়ে বলে ভয় পাবেন না, আতঙ্কিত হবেন না অপেক্ষা করেন আপনাকে আমরা উদ্ধার করব। এই অভয়ের সময় মনে হয় ভয়কে জয় করার মধ্যে চরম আনন্দ বিরাজমান।

পাঠকের মন্তব্য

লাইভ

টপ