সর্বশেষ :

মহাদেবপুরে একের পর এক সাংবাদিকের উপর হামলা

ইউনুস আলী ফাইম ১১:৫৭, ২৭ আগস্ট ২০১৯

নওগাঁর মহাদেবপুরে একের পর এক সাংবাদিকের উপর হামলার ঘটনা ঘটছে। গত পাঁচ বছরে এ উপজেলায় প্রায় ১০ বার সাংবাদিকের উপর হামলার ঘটনা ঘটে। প্রশাসনের নাকের ডগায় একের পর এক হামলার ঘটনায় গণমাধ্যমকর্মীরা আতঙ্কিত হলেও রহস্যজনক কারণে দর্শকের ভূমিকায় প্রশাসন। এক প্রকার ঘোষণা দিয়েই প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থাকা কিছু দুষ্কৃতীকারীরা হামলা করছেন। হামলার পর থানা পুলিশকে অবগত করলে ও মামলার জন্য অভিযোগ করা হলেও বিষয়টি আমলে নেয়া হয়না। প্রভাবশালীদের চাপের কারণে পুলিশ এমনটা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, সাংবাদিকরা অনিয়ম ও দূর্নীতির সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশ করা নিয়ে হুমকির মধ্যে থাকে। গত পাঁচ বছরে প্রায় ১০ বার সাংবাদিকে মারপিট করা হয়েছে। নওগাঁ জেলার মধ্যে বালুমহাল এলাকা এ উপজেলা। এখানে আত্রাই নদী থেকে নীতিমালা উপেক্ষা করে অবৈধ্য খননযন্ত্র (ড্রেজার) দিয়ে বালু উত্তোলন করা হয়। আত্রাই নদীর বালুমহাল ছাড়াও প্রভাবশালীরা অন্য স্থান থেকে জোরপূর্বক বালু উত্তোলন করে। এতে করে বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধের কংক্রিটের ব্লক (সিসি), নদীর আশপাশে ফসলি জমি, বসতবাড়ি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো হুমকির মুখে পড়েছে। বালু খেকোরা বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজেদের ইচ্ছেমতো বালু উত্তোলন করে। স্থানীয়রা বাঁধা দিতে গেলে মামলা দিয়েও ভয়ভীতি দেখানো হয়। সাংবাদিকরা এসব অনিয়ম নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে বালু খেকোরা বাঁধা প্রদান করেন এবং সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য হুমকিও দেন। এক কথায় বালু খেকোরা পূর্ব ঘোষণা দিয়ে সাংবাদিকদের মারপিট করে থাকেন। আর এর মুলে থাকে সরকার দলীয় কিছু প্রভাবশালীরা।

সাংবাদিকরা নির্যাতনের শিকার হলেও পুলিশের কাছ থেকে তেমন কোন সহযোগীতা পাওয়া যায়না। প্রভাবশালীদের চাপের মুখে থানা পুলিশ নীরব ভূমিকা পালন করেন। পুলিশের নীরব ভূমিকার কারণে প্রভাবশালীরা আরো বেপারোয়া হয়ে উঠেন। সাংবাদিকরা বিচার না পাওয়ায় তারা আবারও সাংবাদিকদের পেটানোর সাহস পান।
বালু মহাল নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে গত ৫ আগষ্ট দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকার মহাদেবপুর উপজেলা প্রতিনিধি ইউসুফ আলী সুমন এবং ‘দুরন্ত সংবাদ’ এর প্রতিনিধি আমিনুর রহমান খোকনকে মহাদেবপুর-পত্নীতলা সড়কের মহিষবথান মোড় এলাকায় পরিকল্পিত ভাবে মারপিট করেছে কিছু অবৈধ বালু ব্যবসায়ী ও তাদের সাঙ্গ-পাঙ্গরা। এসময় তাদের কাছে থাকা ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। হামলাকারীরা সাংবাদিকদের ছিনতাইকারী আবার কেউ কল্লাকাটা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। এরপর দুই সাংবাদিককে মহিষবাথান মোড়ের একটি দোকানে নিয়ে সাটার বন্ধ করে প্রায় ২ ঘন্টা আটকে রেখে একটি সাদা কাগজে লেখা আপোসনামায় জোর করে স্বাক্ষর নেয়া হয়। পরে মোবাইল ফোন ফেরত দেয়া হলেও ক্যামেরা ফেরত দেয়া হয়নি। ঘটনাস্থল থেকে এসে তারা মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেয়।

এ ঘটনায় ইউসুফ আলী সুমন বাদী হয়ে গত ৯ আগষ্ট উপজেলার মহিষবাথান ঘাটের বালু ব্যবসায়ী হেলাল সরদার, মতিন এবং রাসেলসহ অজ্ঞাত ৫-৭ জনের বিরুদ্ধে থানায় এজাহার করেন। এজাহার দায়েরের পর পুলিশ কোন পদক্ষেপ গ্রহন করেনি। এ নিয়ে নানান তালবাহানা শুরু করে থানা পুলিশ। বিষয়টি ভিন্ন খাতেও প্রবাহের চেষ্টা করা হয়। থানায় এজাহার করার ১৭ দিন পর গত ২৫ আগষ্ট রাতে মামলা আকারে রেকর্ড করা হয়।

বালু মহালসহ মহাদেবপুর উপজেলার অনিয়ম ও দূর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করায় গত ২৪ আগষ্ট দৈনিক কালের কন্ঠ পত্রিকার বদলগাছী-মহাদেবপুর প্রতিনিধি এমদাদুল হক দুলুকে হত্যার উদ্দেশ্যে মহাদেবপুর-মাতাজি সড়কের সারাসন মোড় এলাকায় লোহার রড দিয়ে মারপিট করা হয়। এতে তার ডান হাত ভেঙে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম হয়। ঘটনায় থানায় মামলা করতে গেলে থানার অফিসার ইনচার্জ গড়িমসি শুরু করেন। উপজেলার ‘জাহাঙ্গীরপুর মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান সাজুর’ নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরো পাঁচ জনের বিরুদ্ধে অবশেষে মামলাটি গ্রহন করলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আসামী আটক হয়নি।
সাংবাদিক এমদাদুল হক দুলু বলেন, ‘আমি বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে লেখালেখি করি। একটি প্রভাবশী মহল চক্রান্ত্র করে আমার উপর হামলা করতে পারে। থানায় মামলা দায়ের করলেও পুলিশ আসামীদের এখনো আটক করেনি। বিষয়টি দেখার জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।’
সাংবাদিক ইউসুফ আলী সুমন বলেন, ‘সমাজের নানা অসংগতি, সমস্যা ও সম্ভাবনা গণমাধ্যমে প্রকাশ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের সংবাদ কারো বিপক্ষে যেতে পারে, আমরা কারো প্রতিপক্ষ নই। আমি বালু মহালসহ এ উপজেলার বিভিন্ন অনিয়ম-দূর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করি। একটি প্রভাবশী মহলের ছত্রছায়ায় পরিকল্পিতভাবে বালু ব্যবসায়ী ও তাদের সাঙ্গ-পাঙ্গরা গত ৫ আগষ্ট আমাদের উপর হামলা করেছে। এ ঘটনায় গত ৯ আগষ্ট আমি থানায় এজাহার দিলে নানান জল্পনা-কল্পনা শেষে ১৭ দিন পর গত ২৫ আগষ্ট রাতে পুলিশ মামলা রেকর্ড করে।’
এ ব্যাপারে মহাদেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজ্জাদ হোসেন বলেন, থানায় মামলা হয়েছে। আসামী ধরার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

পাঠকের মন্তব্য

লাইভ

টপ