সংশোধন করা হচ্ছে কোম্পানি আইন

নিউজবক্স ডেক্স ০২:১৪, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

কোন একক ব্যক্তির কোম্পানি গঠনের সুযোগ রেখে ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইন সংশোধন করতে যাচ্ছে সরকার। এজন্য বিদ্যমান আইনে ‘এক ব্যক্তি কোম্পানি’ নামে নতুন ধারা যুক্ত করা হচ্ছে। আইনের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে ‘এক ব্যক্তি কোম্পানি’ বলতে এমন একটি প্রাইভেট কোম্পানিকে বোঝাবে যেখানে একজন মাত্র প্রাকৃতিক সত্তা বিশিষ্ট ব্যক্তি ওই কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার হবেন।

একক ব্যক্তির কোম্পানি গঠনের সুযোগ ছাড়াও দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ, ব্যবসা ও বিনিয়োগ সহজ করা, কোম্পানির সাধারণ পাওনাদার ও সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে আইন সংশোধন করা হচ্ছে। আইনটি সংশোধনের বিষয়ে রবিবার আইন মন্ত্রণালয়ে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে একটি পরামর্শ সভা বসে সভায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সভাপতিত্ব করেন। লেজিসলেটিভ রিসার্চ এ্যান্ড রিফর্ম প্রজেক্টের উদ্যোগে এই সভার আয়োজন করা হয়।

সভায় এক-ব্যক্তি কোম্পানি গঠন, এর বার্ষিক সাধারণ সভা, শেয়ার হস্তান্তর, পরিচালক সংখ্যা এবং কোম্পানির মালিকের মৃত্যুর পর এর শেয়ার হস্তান্তর করা বা উত্তরাধিকারদের কোম্পানির দায়িত্ব গ্রহণ, এক-ব্যক্তি কোম্পানি অধিগ্রহণ করা, রূপান্তর পদ্ধতি, ব্যালান্স শীট, শেয়ার হস্তান্তরের সময় রাজস্ব আদায় পদ্ধতি, লিকুইডিটর নিয়োগ ও অবসায়ন হওয়ার আগে মূলধন ফেরত পদ্ধতি ছাড়াও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান কোম্পানি আইন ১৯৯৪ সংশোধনের খসড়া ইতোমধ্যে তৈরি করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সংশোধিত খসড়ায় বিদ্যমান আইনের এ পরিবর্তনের পাশাপাশি যৌথ মালিকানা কোম্পানির পরিচালকের সংখ্যা ১৪ থেকে বাড়িয়ে কমপক্ষে ২১ জন করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত আইনে কোম্পানি গঠন প্রক্রিয়াও আগের তুলনায় সহজ করা হচ্ছে। সহজে ব্যবসা করার সূচকে উন্নতির লক্ষ্যে সরকার এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি সংশোধিত কোম্পানি আইন ২০১৮-এর খসড়ার ওপর আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত (ভেটিং) নিয়েছে। এখন খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। মন্ত্রিসভা অনুমোদন করলে আইনটি পাসের জন্য সংসদে উত্থাপন করা হবে। এর আগে গতবছর নবেম্বরে এ আইনের খসড়ার প্রাথমিক অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা।

মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, আগের আইনে দেশে এক ব্যক্তি মালিকানার কোম্পানি গঠনের সুযোগ না থাকলেও একক পরিবারের মালিকানাধীন অনেক কোম্পানি রয়েছে। আইন পরিপালনের জন্য স্ত্রী, সন্তানদের নামে শেয়ার দিয়ে সাধারণত এমন কোম্পানি গঠন করা হয়। তাদের নিয়েই গঠন করা হয় পরিচালনা পর্ষদ। এসব কোম্পানি পরিবারের প্রধান বা ওই উদ্যোক্তার সিদ্ধান্তেই পরিচালিত হয়। পরিচিতিও পায় ওই ব্যক্তির নামে। এমনকি মালিকানার নিয়ম মানতে গিয়ে অনেক বেনামী শেয়ার রাখার ঘটনাও আছে। যে কারণে এক ব্যক্তির মালিকানার কোম্পানি গঠনের সুযোগ দেয়া হচ্ছে বলে ওই কর্মকর্তা জানান। বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, একজনের মালিকানায় কোম্পানি গঠনের সুযোগ দেয়ার পদক্ষেপ ভাল উদ্যোগ। এতে শুধু আইন পরিপালনের জন্য কোম্পানির নামমাত্র অংশীদার বা পরিচালক তৈরির দরকার হবে না।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খানও এটিকে ভাল উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, দেশের উদ্যোক্তারা অনেকদিন ধরেই এক ব্যক্তির কোম্পানি খোলার সুযোগ চেয়ে আসছেন। আইন সংশোধনের খসড়ায় বলা হয়েছে, এক ব্যক্তির কোম্পানি বলতে এমন কোম্পানি বোঝাবে যেখানে একজন মাত্র ব্যক্তি ওই কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার হবেন। এ ধরনের কোম্পানির নামের শেষে ‘ওয়ান পারসন কোম্পানি’ বা ওপিসি লেখা থাকবে। এগুলোর কোনটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে সেটির নামের শেষে ‘পাবলিক সীমিত দায় কোম্পানি’ বা পিএলসি এবং কোন কোম্পানি প্রাইভেট কোম্পানি হলে সেটির শেষে ‘সীমিত দায়’ বা এলটিডি লেখা থাকতে হবে।

অন্যান্য কোম্পানির মতো এক ব্যক্তির কোম্পানিরও বার্ষিক সাধারণ সভা করতে হবে। সভা অনুষ্ঠানের ২১ দিনের মধ্যে কোম্পানির সচিব বা ম্যানেজার বা এ ধরনের কেউ না থাকলে কোম্পানির পরিচালক সারসংক্ষেপ সই করে নিবন্ধকের কার্যালয়ে পাঠাবেন। মালিকই ওই কোম্পানির পরিচালক হবেন এবং তিনি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনে ব্যবস্থাপক, ম্যানেজার, কোম্পানি সচিব নিয়োগ করতে পারবেন।

এ ধরনের কোম্পানিকে ছয় মাসে কমপক্ষে একটি পরিচালক সভা করতে হবে। তবে একটি সভার ৯০ দিনের মধ্যে পরবর্তী সভা করার দরকার হবে না। এ ধরনের কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন হিসাব বছর সমাপ্তির দিন থেকে পরবর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে সাধারণ সভায় অনুমোদন করে নিবন্ধকের কার্যালয়ে জমা দিতে হবে। প্রতিটি ব্যালেন্স শীট, লাভ-ক্ষতির হিসাব বা আয়-ব্যয়ের প্রতিবেদনে মালিক নিজেই সই করবেন। এ ধরনের কোম্পানি অন্যগুলোর মতো স্বাভাবিক নিয়মেই ব্যাংক ঋণ নিতে পারবে।

অন্য কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ব্যবসাও করতে পারবে। চাইলে স্বেচ্ছা অবলুপ্তির উদ্যোগও নিতে পারবেন মালিক। এ ধরনের কোম্পানির মালিকের মৃত্যুর পর কে মালিক হবেন তা উদ্যোক্তাকে আগে থেকেই অর্থাৎ নিবন্ধনের সময়ই নির্ধারণ করে রাখতে হবে।

রবিবার আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে এক পরামর্শ সভার সভাপতিত্ব করেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। এ সভায় অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন অর্থমন্ত্রী আ.হ.ম মোস্তফা কামাল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারী শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব আসাদুল ইসলামসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং সরকারী-বেসরকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভা পরিচালনা করেন লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ শহিদুল হক। আইনটি সংশোধনের বিষয়ে পরবর্তী পরামর্শ সভা বসবে আগামী ২৭ অক্টোবর।

পাঠকের মন্তব্য

লাইভ

টপ