সব প্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নারীরাও এগিয়ে যাচ্ছেন

অনলাইনডেক্স ০২:২৬, ২১ মার্চ ২০১৯

মেয়ে, স্ত্রী, মা, তিনটি রূপেই নারী। তবে সব প্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নারীরাও এখন এগিয়ে যাচ্ছেন সমানতালে। নেতৃত্ব দিচ্ছেন নিজ দেশের ও বিশ্বের। ক্ষমতার দিক থেকেও তারা এগিয়ে রয়েছেন পুরুষদের থেকেও। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর তেমনই ১০জন নারীর কথা জেনে নিই।
শেখ হাসিনা
শেখ হাসিনাকে ‘লেডি অব ঢাকা’ আখ্যায়িত করে ফোর্বস লিখেছে, তিনি রোহিঙ্গা জনগণের সাহায্যের অঙ্গীকার করেন এবং রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানের জন্য দুই হাজার একর ভূমি বরাদ্দ করেন, যা মিয়ানমারের অং সান সু চি’র সম্পূর্ণ বিপরীত। এতে বলা হয়, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের গণহত্যার কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বিপুল ব্যয় সত্বেও তার দেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে গৌরববোধ করছেন । ইতিমধ্যেই তাদের আইডেন্টিফিকেশন কার্ড এবং শিশুদের টিকাদান করা হয়েছে। এছাড়া, নিন্ম আয়ের দেশ থেকে উত্তীর্ণ হয়ে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত করার পেছনে ‘মাদার অফ হিউম্যানিটি’ ক্ষ্যাত শেখ হাসিনার অবদান অতুলনীয়।
অ্যাঙ্গেলা মার্কেল
অ্যাঙ্গেলা মার্কেলকে বলা হয় মুক্ত বিশ্বের চ্যান্সেলর। গত এক যুগ ধরে তিনি জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি ইউরোপীয় ইউনিউন ভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘকাল ধরে ক্ষমতায় থাকা রাষ্ট্রপ্রধান। দৃঢ় নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং সাম্প্রতিক অভিবাসী সমস্যা সমাধানে তার ভূমিকার জন্য তাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিফ্যাক্টো লিডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বস্তুগত রসায়নে ডক্টরেট ডিগ্রিধারী প্রাক্তন এই গবেষক-বিজ্ঞানী রাজনীতিতে যোগ দেন ১৯৮৯ সালে। ১৯৯১ সালে তিনি মহিলা ও যুবকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং ১৯৯৪ সালে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলেছেন। ২০০০ সালে তিনি তার দল সিডিইউয়ের প্রধানের পদ লাভ করেন। ২০০৫ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করার পর জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে সরকার গঠন করেন।  ২০০৯ এবং ২০১৩ সালের নির্বাচনেও তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। অ্যাঞ্জেলা মার্কেল মোট রেকর্ড সংখ্যক দশ বার ফোর্বস ম্যাগাজিনের বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী মহিলার তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছেন। এছাড়াও তিনি ফোর্বসের বিবেচনায় দু’বার বিশ্বের দ্বিতীয় ক্ষমতাশালী ব্যক্তি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১৫ সালের নভেম্বরে তিনি টাইম ম্যাগাজিনে ‘পার্সন অফ দ্য ইয়ার’ হিসেবে নির্বাচিত হন। টাইস ম্যাগাজিন তাকে ‘চ্যান্সেলর অফ দ্য ফ্রি ওয়ার্ল্ড’ উপাধিতে ভূষিত করে।
টেরিজা মে
বিশ্বের ক্ষমতাধর নারীর তালিকায় প্রথম সারিতে রয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে। তিনি ব্রেক্সিট বিতর্কে অত্যন্ত কঠিন সময়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করের এবং আগাম নির্বাচনের আয়োজন করে বারবার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। কিন্তু সব চ্যালেঞ্জকে শক্ত হাতে মোকাবেলা করে এখনো বহাল তবিয়তে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
মেলিন্ডা গেটস
মেলিন্ডা গেটসের পরিচয় তিনি বিশ্বের শীর্ষ ধনী বিল গেটসের স্ত্রী এবং তার প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের সর্বময় কর্তী। তবে বর্তমানে তার সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় এনজিও বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং সহ-সভাপতি। বিশ্বব্যাপী তার জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য এর আগেও একাধিকবার ফোর্বসের প্রভাবশালী নারীর তালিকায় সেরা দশের মধ্যে স্থান করে নিয়েছিলেন। ২০০৫ সালে তিনি এবং বিল ক্লিনটন টাইমম্যাগাজিনর ‘পার্সনস অফ দ্য ইয়ার’ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এছাড়া তিনি ফ্রান্সের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলান্দে তাকে এবং বিল ক্লিনটনকে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ জাতীয় পুরস্কার ‘লেজিয়ন অব অনারে’ ভূষিত হন।
শেরিল স্যান্ডবার্গ
শেরিল স্যান্ডবার্গ বর্তমান বিশ্বের ব্যবসায়িক জগতের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে একজন। পূর্বে তিনি গুগলের ‘অনলাইন সেলস অ্যান্ড অপারেশন্স’ বিভাগের সহ-সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে তিনি ফেসবুকের চিফ অপারেটিং অফিসার। ২০০৮ সাল থেকেই তিনি এই পদে কর্মরত আছেন। সফলভাবে বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফেসবুককে একটি অত্যন্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার ব্যাপারে তার বিশাল অবদান আছে। ২০১২ সালে তিনি প্রথম নারী হিসেবে ফেসবুকের পরিচালনা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি একইসঙ্গে একজন নারী অধিকার কর্মীও।
ম্যারি বারা
ম্যারি বারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল মোটরস কোম্পানির চেয়ারম্যান এবং সিইও। ২০১৪ সালে কোম্পানিটির সিইওর দায়িত্ব পাওয়া ম্যারি বারা ছিলেন মোটরগাড়ি শিল্পের প্রধান কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রথম মহিলা সিইও। সিইও হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পূর্বে তিনি কোম্পানিটির ক্রয় এবং সরবরাহ বিভাগের নির্বাহী সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। তিনি এখনও পর্যন্ত মোট ছ’বার ফোর্বসের ক্ষমতাশালী নারীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন। এছাড়াও তিনি ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে ফরচুন ম্যাগাজিনের বিশ্বের ক্ষমতাধর মহিলার তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন।
ক্রিস্টিন লাগার্দ
ক্রিস্টিন লাগার্দ বর্তমানে আইএমএফের শীর্ষকর্তা। ২০১১ সালে তার পূর্বসূরী ডোমিনিক স্ট্রস কান যৌন কেলেঙ্কারির দায়ে পদত্যাগ করলে তিনি প্রথম নারী হিসেবে এই পদে নিযুক্ত হন। এর আগে বিভিন্ন সময় তিনি ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী এবং বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০১১ সালে প্রথমে ৫ বছরের জন্য নিযুক্ত হলেও পরবর্তীতে ২০১৬ সালে তাকে আরও ৫ বছরের জন্য আইএমএফের এমডি হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ২০০৯ সালে তাকে ইউরো জোনের শ্রেষ্ঠ অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাদের তালিকায় স্থান দিয়েছিল। ২০১৪ সালে তিনি ফোর্বসের ক্ষমতাধর নারী তালিকায় পঞ্চম স্থান অধিকার করেছিলেন।
অ্যানা প্যাট্রিশিয়া বটিন
অ্যানা প্যাট্রিশিয়া বটিন একজন স্প্যানিশ ব্যাংকার। ২০১৪ সাল থেকে তিনি স্যানট্যান্ডার গ্রæপের নির্বাহী সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এর আগে ২০১০ সাল থেকে তিনি ব্যাংকিং গ্রæপটির যুক্তরাজ্য শাখা স্যানট্যান্ডার ইউকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ইউরো জোনের প্রথম নারী, যিনি প্রধান কোনো ব্যাংকের শীর্ষ পদের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন প্রথম তাকে তাদের তালিকায় ৯৯ নম্বরে স্থান দিয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে তিনি ৪৫তম এবং ২০১৮ সালে ১০ম স্থানে উঠে আসেন। এছাড়াও বিবিসি রেডিওর উইমেন’স আওয়ার অনুষ্ঠান তাকে ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্যের তৃতীয় ক্ষমতাধর নারী হিসেবে তাদের তালিকায় স্থান দিয়েছিল।
জিনি রমেটি
ভার্জিনিয়া ম্যারি রমেটি বা জিনি রমেটি বিখ্যাত কম্পিউটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আইবিএমের সভাপতি এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রথম নারী প্রধান। ১৯৮১ সাল থেকে তিনি আইবিএমের সাথে জড়িত আছেন। ২০১২ সালে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পূর্বে তিনি দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট সহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৫ সালে ফরচুন ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীর তালিকায় তিন নম্বরে স্থান দিয়েছিল। ফোর্বস ম্যাগাজিনের ২০১৪ সালের তালিকায়ও তিনি দশম ক্ষমতাধর নারী হিসেবে স্থান পেয়েছিলেন।

অং সানসুচি
মায়ানমার সম্পর্কিত কোনো কথা আসলেই সবার আগে অং সান সু চির নামটিই চলে আসে। মায়ানমার বলতে অনেকটা সু চিকেই বুঝায়। একটা সময় ছিল যখন মায়ানমারে গণতন্ত্র কথাটি পরিচিত ছিল না বললেই চলে। প্রায় দীর্ঘ ৫০ বছর সমগ্র মায়ানমার জুড়ে মিলিটারি একনায়কতন্ত্র বিরাজমান ছিল। মায়ানমারে ১৯৬০ এর দশকে জনতা নামক দল ক্ষমতা দখল করে। সু চি ১৯৮৮ সালে এ দলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং জনগণের পক্ষ হয়ে ন্যাশনাল লীগ ফর ডিমোক্রেসি গঠন করে। মিলিটারি তাকে প্রায় ২০ বছর গৃহবন্দী করে রাখে। সম্প্রতি রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বিশেষ মহলের কাছে নিন্দিত হলেও বিশ্বের ক্ষমতাবান নারীদের মধ্যে তিনিও একজন।

পাঠকের মন্তব্য

লাইভ

টপ