সমসাময়ীক সমস্যা নিয়ে সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে সাপাহার থানার ওসি আব্দুল হাই

মাদকের মতো ভয়াবহ ক্ষতিকর রুপ নিয়েছে সমাজে দাদন ব্যাবসা। যার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে অভাবি পরিবারের সদস্যরা। বিশেষকরে দিনমজুর, শ্রমিক, রিক্সা-ভ্যান চালকসহ স্বল্প আয়ের মানুষ। তাদের আয়ের দুরাবস্থার দুর্বলাতার সুযোগে এক শ্রেনীর অসাধু দাদন ব্যাবসায়ীরা এই মানুষগুলিকে  জিম্মিকরে ফায়দা লুটছে।
উত্তরবঙ্গের নওগাঁ সাপাহরের অবস্থাও দেশের অনান্য জেলা, থানা অঞ্চলের মতো। এছাড়াও সমসাময়ীক সমস্যা নিয়ে নিউজ বক্সের সাথে সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে যুক্ত হয়েছিলেন সাপাহার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইনেসপেক্টর মো: আব্দুল হাই নিউটন।
সাক্ষাৎকার গ্রহনে নওগাঁ প্রতিনিধি ইউনুস আলী ফাইম।

নিউজবক্স: নিউজবক্সের সংবাদ আঙ্গিনায় আপনাকে শুভেচ্ছা। প্রথমেই নওগাঁ জেলাধীন সাপাহার থানায় কর্মযোগে আপনাকে শুভেচ্ছা।
ইনেসপেক্টর মো: আব্দুল হাই নিউটন: আপনার মাধ্যমে আমি নওগাঁ জেলাবাসীসহ  আমার বর্তমান কর্মস্থল সাপাহার থানাবাসীর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি আমাকে সকল সময়ে সার্বীক সহযোগীতা করার জন্য।
নিউজবক্স: মাদক ও দাদন ব্যবসা এই দুটিকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ণ করবেন ?
ইনেসপেক্টর মো: আব্দুল হাই নিউটন: মাদক দেশ, সমাজ, জাতির জন্য একটি কলংকের নাম ও উপাদন। একটি দেশের ভবিষ্যতকে বিকলাঙ্গ করতে মাদক যথেষ্ট বলে আমি মনে করি। যেহেতু মাদকের প্রতি আসক্ত যুবসমাজের বেশি থাকে সেহেতু এ যুব সমাজকে ধংস করার জন্য মাদক একাই একশ। তরুণ- যুবকরা যেহেতু আগামীর ভবিষ্যৎ সেহেতু এরা ধংস হয়ে গেলে দেশ ও জাতিই ধংস হয়ে যাবে। সে কারনে মাদককে আমি সবার জন্যই খুবই খুবই ক্ষতিকর  বলবো। আর দাদন ব্যবসা মাদকের মতো তড়িৎ ক্ষতি না করলেও এটি দীর্ঘমেয়াদী ও কোন পরিবারের একাধিক সদস্যদের জন্য ক্ষতির কারন হিসাবে দায়ী করবো।
নিউজবক্স: এনজিও ও দাদন ব্যবসাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
ইনেসপেক্টর মো: আব্দুল হাই নিউটন:  দেশের বেসরকারী উন্নয়ণ সংস্থা বা এনজিও গুলি দেশের প্রচলিত নিয়ম-কানুন মেনে আইনানুগভাবে পরিচালিত হয়। এনজিওগুলিকে নিয়মিত মনিটরিং করার জন্য এনজিও   তবে এনজিও ব্যুরো নামে সরকারের একটি আলাদা সংস্থাই রয়েছে। যারা নিয়মিতভাবে এনজিওগুলিকে তাদের  ঋন কার্যক্রমকে তদারকি করে। এছাড়াও বাংলাদেশ ব্যংকে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলারেটি অথারেটি নামে একটি আলাদা অথারেটি অংশ রয়েছে যারা দেশের রেজিষ্ট্রিকৃত এনজিওগুলির ঋন কার্যক্রমকে তদারকি করে থাকে।
কিন্তু দাদন ব্যবসায় নেই কোন তদারকি নিয়ম-কানুন অথবা আইনের বৈধতা। এটি সম্পূর্ণরুপে অবৈধ একটি মহাজনী ব্যবসা। যা সম্পূর্ণরুপে বে-আইনী ও অপরাধ মূলক কাজ।
নিউজবক্স: বাস্তবতায় এনজিও ও দাদন ব্যবসায় কি সমস্যগুলি দেখতে পেয়েছেন ?
ইনেসপেক্টর মো: আব্দুল হাই নিউটন:  সাধারণত ৯০ ভাগ পরিবার বিভিন্ন এনজিও থেকে সাবপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তিতে পরিশোধ করার অঙ্গিকারে ঋন গ্রহন করেছেন। অনেক মধ্যবিত্ত এবং ছোট বরিরার রয়েছেন যাদের সাপ্তাহিক কিস্তি বাবদ দিতেহয় ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা বা তার অধিক। এই কিস্তি টাকার যোগান দিতে কেউ সক্ষম হন আবার কেউ অক্ষম হন । টানাপোড়নের মধ্যদিয়েই চলে অভাবী সংসার।
এমনতাবস্থায় সংসারে কোন বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হলে তা যোগান দিতে অভাবি মানুষ বিভিন্ন দাদন ব্যাবসায়দের স্বরণাপন্ন হয়। তখন ব্যাক্তি পর্যায়ের দাদন ব্যাবসায়ীরা প্রতি হাজারে ১ শত থেকে ৪ শত টাকা মাসিক সুদের চুক্তিতে অভাবি পরিবারের সদস্যদের মাঝে অভ্যন্তরীন চুক্তির মাধ্যমে লেনদেন করে। কখনও সাদা ষ্টাম্প, টাকার অংক লেখা ছাড়াই সাদা স্বাক্ষরযুক্ত চেক নিয়ে ঋণ দিচ্ছেন। যা একটি অপরাধ। চড়া সুদের কারনে একপর্যায়ে ঋন দাতা এবং গ্রাহকের মধ্যে দন্দ তৈরী হয় । তখন গ্রাহককে দাদন ব্যাবসায়ীরা স্থানিয় পাতি মাস্তানদের যোগসাজেশে নানা ভাবে হয়রানি করে। এরকম অভিযোগ দেশের বিভিন্ন থানাগুলির মতো আমার সাপাহার থানাতেও আসে।
নিউজবক্স: দাদন ব্যবসা নিয়ে শুধুকি অভিযোগ, হয়রানীই হচ্ছে নাকি তার চাইতেও বেশি কিছু হচ্ছে ?
ইনেসপেক্টর মো: আব্দুল হাই নিউটন:  না শুধু অভিযোগের মধ্যে সীমাবন্ধ থাকলে হয়তো এর ক্ষতিকারক দিক একটু কম থাকতো। অনেক সময়ই অসাধু দাদন দাতাদের হয়রানির শিকার হয়ে মানুষ মানষিক ভাড়সাম্য হারিয়ে ভিটামাটি ছারাহচ্ছে। এমনকি আত্মহত্যার মত পথ বেছে নিচ্ছেন। আমরা অনেক সময় আপনাদের মিডিয়ার কল্যাণে এ ধরনের সংবাদ দেখতে পাই। যদিও আত্মহত্যার প্রবণতা আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে খুব বেশি। একসময় হালের বলদ, ছাগল, অথবা বাড়ীর টিন খুলে নেয়ার মতো ঘটনাও আমাদের দেশে ঘটছে বলে আমরা জেনেছি। তবে এধরনের ঘটনা আমাদের স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোরতার কারনে এখন নেই বললেই চলে।
নিউজবক্স: দাদন ব্যবসায় দাদনকারী গ্রহনকৃত চেক নিয়ে কি কোন প্রকার হয়রানী করছে ?
ইনেসপেক্টর মো: আব্দুল হাই নিউটন: অবশ্যই করছে। আপনি খোজ নিয়ে দেখুন ৫০% চেকের (এন,আই এ্যাক্ট) মামলার ওয়ারেন্ট ইস্যু হচ্ছে টাকা নেবার সময় ব্লাইংক চেক দিয়ে দিতে না পারায় দাদনদাতারা ইচ্ছে মত টাকার অংক বসিয়ে নিচ্ছেন। অনেক সময় মামলা করছে। আর স্থানীয় ক্ষমতাবানদের হয়রানীতো রয়েছেই।
নিউজবক্স: আপনার থানাধীন এরকম কোন হয়রানীর ঘটনায় বা দাদন প্রতিরোধে কি কোন পদক্ষেপ নিয়েছেন ?
ওসি আব্দুল হাই নিউটন: আমি ইতিমধ্যে আমার সাপাহার থানধীন সকল জনগনকে অনুরোধ করেছি লাখে ১০ হাজার বা তার বেশি সুদে টাকা দেয়া নেয়া ব্যাক্তিদের চিহ্নিত করে সরাসরি আমাকে অবহিত করুন। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগত ব্যাবস্থা গ্রহন করা হবে।
ইতিপুর্বে নওগাঁ সদর থানায় কর্তব্যরত অবস্থায় ব্যাক্তিগত উদ্যেগে অসাধু দাদন দাতাদের তথ্য দেয়ার জন্য বিভিন্ন ইউনিয়নে মাইকিং করেছি। বর্তমানে সাপাহারে যোগদানের পর বিভিন্ন আলোচনা সভাই এবিষয়ে সকলকে অবগত করছি। ঈদের পর সাপাহার ইউনিয়ন পর্যায়ে অসাধু দাদন দাতাদের ধরিয়ে দিতে মাইকিং করার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এবিষয়ে আমি সাপাহার থানার সকল জনসাধারণদের সহযোগিতা কামনা করছি।


নিউজবক্স: ছেলেধরা গুজবের প্রভাব দেশের অনান্য স্থানের মতো আপনার সাপাহার থানায় কিরুপ প্রভাব ফেলেছে এবং এর মোকাবেলায় আপনারা কি পদক্ষেপ নিয়েছেন?
ইনেসপেক্টর মো: আব্দুল হাই নিউটন: দেশের বৃহৎ অবকাঠানো পদ্মা সেতু নির্মান হচ্ছে। একশ্রেনীর মতলববাজরা গুজব ছড়িয়েছে পদ্মাসেতুতে মাথা লাগবে। সেই গুজবের সাথে যুক্ত হয়েছে ছেলেধরা গুজব। আমাদের সাপাহার থানাতেও দু’একটি অনাকাংখিত ঘটনার সৃষ্টির চেষ্টা হলেও স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কঠোর নজরদারীতে তেমন কোন ঘটনা ঘটেনি। আমরা প্রশাসনের পক্ষহতে নিয়মিত জনসচেতনতা মূলক বৈঠক, র‌্যালী করছি।
নিউজবক্স: ডেঙ্গু প্রতিরোধে আপনারা প্রশাসনের পক্ষ হতে কি কোন পদক্ষেপ নিয়েছেন?
ইনেসপেক্টর মো: আব্দুল হাই নিউটন: অবশ্যই নিয়েছি।  মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা সপ্তাহ পালনের অংশ হিসাবে সাপাহারে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। আমাদের কার্যক্রমের  সাথে উপজেলা পরিষদও যুক্ত রয়েছে। আমরা কিছুদিন পূর্বই উপজেলা চত্ত্বর থেকে শুরু করে সদরের পুরো বাজারে লিফলেট বিতরণ করেছি। পাশাপাশি প্রশাসন এলাকা সহ সদরের গুরুত্বপূর্ণ ড্রেন, নালাসহ অন্যান্য ময়লা পরিষ্কার কার্যক্রম শুরু করেন এবং মশা নিধনের স্প্রে করা হয়। আমাদের সাথে এলাকার বিভিন্ন স্থানে লিফলেট বিতরণ করেন সাপাহার উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব শাহজাহান হোসেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) কল্যাণ চৌধুরী, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদ, উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের অফিসার, সাংবাদিক সহ অনেকেই।
নিউজবক্স: ডেঙ্গু প্রতিরোধে জেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে কি কোন পদক্ষেপ নিয়েছেন?
ইনেসপেক্টর মো: আব্দুল হাই নিউটন: ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও করণীয় বিষয়ে নওগাঁ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ডেঙ্গু প্রতিরোধে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
জেলা প্রশাসক হারুন অর রশিদ এর সভাপতিত্বে সভায় ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের করণীয় বিষয়গুলো আলোকপাত করা হয়। পাশাপাশি পৌরসভার মেয়র সহ সকল কাউন্সিলরদের জেলা প্রশাসক নির্দেশ দেন ডেঙ্গু মশা তৈরীর ময়লা আবর্জনা জমে থাকা পানি খুব দ্রুত অপসারণ ও পরিষ্কার করে শহরকে ডেঙ্গু মুক্ত রাখার।


নিউজবক্স: ডেঙ্গু প্রতিরোধে সাপাহার থানাধীন জনসাধারনের প্রতি আপনার বক্তব্য কি থাকবে ?
ইনেসপেক্টর মো: আব্দুল হাই নিউটন: আমি আমার কর্মস্থল সাপাহার থানাধীন সকল জনসাধারনকে বলবো, আপনাদের নিজ নিজ বাড়ীতে জমে থাকা পানি বা বাড়ীর পার্শ্বে জমে থাকা অপরিস্কার পানি ফেলে দিতে। বাড়ীতে কোন পাত্রে জমে রাখা পানি সপ্তাহে একবার ফেলে দিয়ে পরিস্কার করে পানি ব্যবহার করি। ফুলের টব, প্লাষ্টিকের পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাষ্টিকের ড্রাম, মাটির পাত্র, বালতি টিনের কৌটা, ডাবের খোসা/নারিকেলের মালাসহ ইত্যাদি মশা বহন করা ডেঙ্গু সকল ভাইরাস কে ধ্বংস করি। মশারী ব্যবহার করি। নিজে ডেঙ্গু মুক্ত থাকি অপরকে ডেঙ্গু মুক্ত রাখার চেষ্টা করি।

নিউজবক্স: ব্যস্ততার মাঝে আপনার সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারের জন্য নিউজবক্সের পক্ষ হতে আপনাকে ধন্যবাদ।
ইনেসপেক্টর মো: আব্দুল হাই নিউটন: বর্তমানের সমসাময়ীক বিষয়ে কথা বলার জন্য আপনাকে ও নিউজবক্স’কে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ।

পাঠকের মন্তব্য

লাইভ

টপ